নিকুরদহ গ্রামে কোরবানির ঈদ মানেই এক আলাদা উৎসব। গ্রামের রাস্তায় তখন শুধু গরু আর মানুষের ভিড়। কেউ গরুর দাঁত দেখে, কেউ লেজ ধরে টানে, আবার কেউ শুধু দাম শুনেই বলে-
‘এই গরু নিশ্চিত বিদেশি জাতের!’
এই গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত মানুষ ছিলেন মোক্তার চাচা। প্রতি বছর তিনি এমনভাবে গরুর গল্প করতেন যেন পুরো জেলার সেরা গরু শুধু তিনিই চিনতে পারেন।
তার স্ত্রী রহিমা খালা অবশ্য এসব শুনে হেসেই উড়িয়ে দিতেন। কারণ গত বছর মোক্তার চাচা যে ছাগল কিনেছিলেন, সেটা এক রাতে তিন বাড়ির শাকখেত শেষ করে দিয়েছিল।
এবার মোক্তার চাচা হাট থেকে বিশাল এক লাল গরু কিনে আনলেন। গরুর নাম দিলেন ‘বাহাদুর’।
গরু দেখে গ্রামের ছেলে টিপু, রিপন আর বাবলু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
টিপু বলল,
‘চাচা, এই গরু কি খুব শান্ত?’
মোক্তার চাচা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
‘এই গরু এত ভদ্র যে পাশে বইসা গান গাইলেও কিছু বলবে না!’
কিন্তু কথাটা বলার একটু পরই বিপদ শুরু হলো।
বাহাদুর হঠাৎ এমন এক হাম্বা ডাক দিল যে পাশের বাড়ির হাঁসগুলো ভয় পেয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিল। তারপর গরু এক ঝটকায় দড়ি ছিঁড়ে বাজারের দিকে দৌড়!
মোক্তার চাচা চিৎকার করতে করতে পেছনে ছুটলেন
‘ধরো! কেউ আমার গরুরে ধরো!’
তার পেছনে টিপু, রিপন, বাবলুÑ আর তাদের পেছনে পুরো নিকুরদহ গ্রাম।
গরু গিয়ে প্রথমে ঢুকল কুদ্দুস মাস্টারের সবজির খেতে। সেখানে গিয়ে বাঁধাকপি খেতে শুরু করল এমনভাবে, যেন বহুদিন কিছু খায়নি।
কুদ্দুস মাস্টার মাথায় হাত দিয়ে বললেন
‘এইটা গরু না, কৃষি বিভাগের দুর্যোগ!’
তারপর গরু স্কুল মাঠে ঢুকে ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিল। ছেলেরা বল ফেলে দৌড়ে পালাল। শুধু বাবলু কাদায় পিছলে পড়ে গেল। তাকে দেখে গরুও কিছুক্ষণ থেমে তাকিয়ে রইল।
অনেক কষ্টে গরুকে ধরে বাড়িতে আনা হলো। কিন্তু তখন দেখা গেল মোক্তার চাচার নতুন পাঞ্জাবির হাতা ছিঁড়ে গেছে, আর রিপনের এক পাটি স্যান্ডেল হারিয়ে গেছে।
সন্ধ্যায় রহিমা খালা বিরক্ত হয়ে বললেন,
‘তোমার গরুরে দেখলে আমারই ভয় লাগে!’
মোক্তার চাচা গম্ভীর হয়ে বললেন,
‘আমি ছোটবেলায় মহিষ সামলাইছি!’
ঠিক তখনই গরু এমনভাবে মাথা ঝাঁকাল যে মোক্তার চাচা সোজা পানির ড্রামের মধ্যে পড়ে গেলেন।
পরদিন সকালে মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা হলোÑ ‘কোরবানির চামড়ায় সবাই লবণ লাগাইবেন।’
এই কথা শুনে মোক্তার চাচা এত ব্যস্ত হয়ে গেলেন যে ভুল করে গরুর খাবারের বদলে সামনে লবণের বস্তা খুলে রাখলেন।
বাহাদুর এক চাটা দিয়েই এমন মুখ বানাল, যেন জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারণার শিকার হয়েছে।
এরপর থেকে বাহাদুর মোক্তার চাচাকে দেখলেই রাগী চোখে তাকায়।
ঈদের দিন সকালে পুরো গ্রাম প্রস্তুত। কিন্তু মোক্তার চাচার বাড়িতে তখনো কসাই নেই। কারণ মুসা কসাই নাকি একসঙ্গে চার বাড়িতে বুকিং খেয়েছে।
অনেক অপেক্ষার পর মুসা কসাই সাইকেলে করে এলেন। এসে প্রথমেই বললেনÑ ‘আগে এক কাপ চা খামু।’ এই কথা শুনে রিপন ফিসফিস করে বলল,
‘চা খাইতে খাইতে গরু আবার পালাইলে?’
কথা শেষ হতেই বাহাদুর আবার দড়ি ছিঁড়ে দৌড়!
এবার গরু সোজা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চেয়ারম্যান সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন-
‘এই গরুরে ভোটে দাঁড় করাইলে মনে হয় জিতব!’
সবাই হেসে গড়াগড়ি।
অনেক দৌড়াদৌড়ি আর হাসাহাসির পর শেষ পর্যন্ত সব কাজ শেষ হলো।
সন্ধ্যায় মোক্তার চাচা হাঁপাতে হাঁপাতে উঠানে বসেছিলেন। টিপু জিজ্ঞেস করল-
‘চাচা, আগামী বছর আবার গরু কিনবেন?’
মোক্তার চাচা চোখ বন্ধ করে বললেন-
‘না রে বাবা, আগামী বছর কবুতর পালমু!’
ঠিক তখন পাশের বাড়ির একটা মোরগ এসে তার লুঙিতে ঠোকর দিল।
পুরো উঠান আবার হাসিতে ফেটে পড়ল!

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন