এক যে ছিল দেশ, তার নাম নেভারল্যান্ড। সেখানে নীল আকাশজুড়ে মেঘেরা অলস ভেসে বেড়াত, সমুদ্রে জলপরীরা গান গাইত, আর বনের মধ্যে লুকিয়ে থাকত রুপালি ডানার পরীরা। সেই দেশের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য ছিল এক ছেলে তার নাম পিটার প্যান। পিটারের সোনালি চুল আর চোখে সবসময় দুষ্টুমির হাসি। আর সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানো? পিটার কোনোদিন বড় হতো না! সে চিরকাল এক ছোট্ট স্বাধীন শিশুই রয়ে গেল। পিটারের সঙ্গে সবসময় থাকত এক পুঁচকে পরি, নাম তার টিঙ্কার বেল। সে যখন উড়ত, ঝুনঝুন করে ঘণ্টার মতো শব্দ হতো আর তার গা থেকে ঝরে পড়ত সোনার গুঁড়ার মতো জাদুকরী ধুলো।
নেভারল্যান্ড থেকে অনেক দূরে, আমাদের এই চেনা পৃথিবীতে ছিল লন্ডন শহর। সেখানে এক বাড়িতে থাকত তিন ভাইবোনÑ ওয়েন্ডি, জন আর মাইকেল। বড় বোন ওয়েন্ডি খুব সুন্দর গল্প বলতে পারত। প্রতি রাতে সে যখন তার ভাইদের জলদস্যু আর পরীদের গল্প শোনাত, জানালার বাইরে অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে পিটার তা শুনত। একদিন রাতে পিটার পালাতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় তার নিজের ছায়াটা ফেলে যায়। পরের রাতে পিটার আবার এলো তার ছায়াটা খুঁজতে। ছায়া না জুড়াতে পেরে পিটারের কান্না দেখে ওয়েন্ডির ঘুম ভেঙে গেল। সে খুব যতœ করে পিটারের পায়ের সঙ্গে তার ছায়াটা সেলাই করে দিল। ছায়া ফিরে পেয়ে পিটার আনন্দে সারা ঘরে নেচে বেড়াল। সে ওয়েন্ডিকে বলল, ‘তুমি এত সুন্দর গল্প জানো, আমার সঙ্গে নেভারল্যান্ডে চলো না? সেখানে আমাদের সঙ্গে আরও কিছু ছোট ছোট ছেলে থাকে, যাদের কোনো মা নেই। তুমি আমাদের মা হবে!’
ওয়েন্ডি আর তার ভাইয়েরা তো অবাক! কিন্তু তারা উড়বে কী করে? টিঙ্কার বেল এসে বাচ্চাদের মাথায় একটু জাদুকরী ধুলো ছিটিয়ে দিল। আর অমনিÑ মিরাকল! ওয়েন্ডি, জন আর মাইকেল বাতাসের মধ্যে হালকা হয়ে ভেসে উঠল। পিটার বলল, ‘ছুটে চলো! ডানদিকের দ্বিতীয় তারাটা পার হয়ে, একদম সকাল হওয়া পর্যন্ত সোজা!’ নেভারল্যান্ডে পৌঁছে পিটারের বন্ধুদের দল ‘লস্ট বয়েজ’ ওয়েন্ডিকে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠল। কিন্তু নেভারল্যান্ডে শুধু আনন্দ ছিল না, সেখানে ছিল এক ভয়ানক জলদস্যু ক্যাপ্টেন হুক। হুকের একটা হাত ছিল না, তার জায়গায় লাগানো ছিল একটা লোহার হুক। পিটারের সঙ্গে লড়াইয়ে হুকের হাতটি কেটে এক কুমির খেয়ে ফেলেছিল। কুমিরটা একটা আস্ত ঘড়িও গিলে ফেলেছিল, তাই সে যখনই আসত, আওয়াজ হতোÑ ‘টিক-টক, টিক-টক’! হুক এই শব্দ শুনলেই ভয়ে কাঁপত, আর মনে মনে পিটারকে শেষ করার সুযোগ খুঁজত। একদিন সুযোগ বুঝে হুক ওয়েন্ডি আর বাচ্চাদের বন্দি করে তার জাহাজে নিয়ে গেল এবং পিটারের জলের পাত্রে বিষ মিশিয়ে দিল। পিটারকে বাঁচাতে চঞ্চল টিঙ্কার বেল নিজেই সেই বিষাক্ত জল খেয়ে নিল। বিষের শান্তিতে টিঙ্কার বেলের গায়ের আলো যখন নিভে আসছিল, তখন সারা পৃথিবীর শিশুদের বিশ্বাসের শক্তিতে সে আবার বেঁচে উঠল। এবার রাগে ফেটে পড়ে পিটার একাই ছুটে গেল ক্যাপ্টেন হুকের জলদস্যু জাহাজে। সেখানে শুরু হলো এক তুমুল যুদ্ধ! একদিকে তলোয়ার হাতে নিষ্ঠুর হুক, অন্যদিকে বাতাসে উড়ে লড়াই করা চতুর পিটার প্যান। হুক যখন পিটারকে আঘাত করতে যাবে, তখনই পাশ থেকে শব্দ এলো টিক-টক, টিক-টক! হুক ভয়ে পেছনে তাকাতেই পিটার তাকে একটা ধাক্কা দিল। হুক গিয়ে পড়ল সোজা সমুদ্রে, আর সেই হা করা কুমিরটা তাকে এক গ্রাসে গিলে নিল। যুদ্ধ জয়ের পর ওয়েন্ডি আর তার ভাইদের তাদের আসল মা-বাবার জন্য মন কেমন করতে লাগল। পিটার জাদুকরী ক্ষমতায় জলদস্যুদের জাহাজটাকেই আকাশে উড়িয়ে তাদের লন্ডনের বাড়িতে পৌঁছে দিল। মা-বাবা তাদের সন্তানদের ফিরে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং লস্ট বয়েজদেরও দত্তক নিলেন। সবাই সিদ্ধান্ত নিলÑ তারা বড় হবে। কিন্তু পিটার প্যান জানালার গ্রিল ধরে মাথা নেড়ে বলল, ‘না, আমি বড় হতে চাই না! আমি চিরকাল ছোট থেকে শুধু আনন্দ করতে চাই।’ ওয়েন্ডি চোখের জল মুছে পিটারকে বিদায় জানাল। পিটার প্যান টিঙ্কার বেলকে সঙ্গে নিয়ে আবার উড়ে চলে গেল সেই রূপকথার দেশ নেভারল্যান্ডেÑ যেখানে সে আজও মুক্ত পাখির মতো আকাশে উড়ে বেড়ায়।
জে. এম. ব্যারির পিটারপ্যান গল্পের অনুবাদ করেছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন