× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

 মেহরুন নিশি

প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৫৫ এএম

জাদুর বাজনা ও সাহসী কুবোর রূপকথা

 মেহরুন নিশি

প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৫৫ এএম

জাদুর বাজনা  ও সাহসী কুবোর রূপকথা

অনেক বছর আগের কথা। দূর পাহাড়ের নির্জন গুহায় কুবো নামের বারো বছরের এক একচোখা ছেলে তার অসুস্থ মায়ের সঙ্গে থাকত। কুবোর জীবনটা আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো ছিল না। তার কাছে ছিল একটি জাদুকরী জাপানি বাদ্যযন্ত্র, যার নাম শামি সেন। কুবো সেই বাদ্যযন্ত্রের তারে আঙুল ছোঁয়ালেই সুরের জাদুতে সাধারণ কাগজের টুকরোগুলো জীবন্ত খেলনায় পরিণত হতো। কুবো প্রতিদিন গ্রামের বাজারে গিয়ে এই জাদুর পুতুল দিয়ে তার নিখোঁজ বাবা হানজোর বীরত্বের গল্প শোনাত। হানজো ছিলেন একজন মহান সামুরাই যোদ্ধা। কিন্তু কুবো কখনোই তার গল্পটি শেষ করতে পারত না, কারণ সে নিজে জানত না তার বাবার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল।  কুবোর মায়ের কড়া নির্দেশ ছিল, কুবো যেন কখনোই সূর্যাস্তের পর বাইরে না থাকে। কারণ রাত হলেই আকাশ থেকে নেমে আসবে কুবোর নিষ্ঠুর খালা এবং তার দাদু চন্দ্ররাজা, যিনি কুবোর ছোটবেলাতেই তার এক চোখ চুরি করেছিলেন এবং এখন অন্য চোখটিও কেড়ে নিতে চান।

কিন্তু একদিন উৎসবের রাতে কুবো সময়ের কথা ভুলে যায়। যার ফলে সে সূর্যাস্তের আগে বাড়ি ফিরতে পারে না। সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্ররাজার পাঠানো দুই জাদুকরী খালা তাকে আক্রমণ করে বসে। কুবোর মা তাকে বাঁচাতে নিজের শেষ জাদুশক্তি ব্যবহার করে কুবোকে এক ফুঁৎকারে অনেক দূরে পাঠিয়ে দেন। বিদায়বেলার আগে মা তাকে নির্দেশ দেন বাবার জাদুকরী বর্ম ও অস্ত্রগুলো খুঁজে বের করার জন্য, যা তাকে এই দুষ্ট শক্তির হাত থেকে রক্ষা করবে। কুবো যখন চোখ খোলে, সে নিজেকে বরফের দেশে আবিষ্কার করে। সেখানে সে দেখতে পায় তার মায়ের দেওয়া কাঠের তুষার-বানরের পুতুলটি জাদুর মাধ্যমে একটি জীবন্ত বানরে রূপান্তরিত হয়েছে। পথিমধ্যে তাদের সঙ্গে দেখা হয় বিটলের সঙ্গে, যে ছিল স্মৃতিভ্রষ্ট এক সামুরাই যোদ্ধা। কুবোর বাবার একটি জাদুকরী অরিগামি পুতুলের দিকনির্দেশনায় এই ত্রয়ী জাদুকরী অস্ত্রের সন্ধানে এক অভিযানে বের হয়।

তাদের এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। একটি বিশাল ভয়ংকর কঙ্কালের পাহারা এড়িয়ে অন্ধকার গুহা থেকে তারা উদ্ধার করে অক্ষয় তলোয়ার। এরপর তারা একটি জাদুকরী নৌকায় চড়ে বিশাল হ্রদ পার হয়, যার পানির নিচে লুকিয়ে ছিল অভেদ্য বুকবর্ম। সেখানে কুবো একটি সামুদ্রিক দানবের খপ্পরে পড়ে এবং মায়াজালে আটকা পড়ে এবং সেখানে সে জানতে পারে, তার সঙ্গে থাকা কথা বলা বানরটি আসলে আর কেউ নয়, স্বয়ং তার মায়ের পুনর্জন্মিত আত্মা। দানবের হাত থেকে রক্ষা পেলেও কুবোর এক খালা তাদের আক্রমণ করে এবং মাংকি নিজের জীবন বাজি রেখে সেই খালাকে ধ্বংস করে। এরপর তারা যখন বাবার পুরনো দুর্গে শেষ অস্ত্র অজেয় শিরস্ত্রাণ খুঁজতে যায়, তখন চন্দ্ররাজার দ্বিতীয় খালা হাজির হয় এবং বিটলকে হত্যা করে। মৃত্যুর ঠিক আগে প্রকাশ পায় যে এই বিটলই আসলে কুবোর বাবা হানজো, যাকে চন্দ্ররাজা অভিশাপ দিয়ে পোকার রূপ দিয়েছিলেন। মাংকিও কুবোকে বাঁচাতে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়। বাবা-মায়ের এই চরম আত্মত্যাগের পর কুবো জাদুর মাধ্যমে সরাসরি তার গ্রামে ফিরে আসে।

গ্রামে পৌঁছে কুবোর মুখোমুখি হয় তার দাদু চন্দ্ররাজা। চন্দ্ররাজা তাকে প্রলোভন দেখায় যে কুবো যদি তার ডান চোখটিও দিয়ে দেয়, তবে সে স্বর্গের মতো অমর হয়ে যাবে এবং পৃথিবীর সব দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু কুবো মানুষের মরণশীল জীবন এবং পৃথিবীর সুন্দর স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে রাখার কথা বলে তা প্রত্যাখ্যান করে। ক্ষিপ্ত হয়ে চন্দ্ররাজা এক বিশাল দানবীয় সামুদ্রিক প্রাণীর রূপ ধারণ করে পুরো গ্রাম ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। কুবো বুঝতে পারে যে তার বাবার জাদুকরী বর্ম এই দানবকে থামাতে পারছে না। সে বর্মটি খুলে ফেলে তার বাদ্যযন্ত্রটিকে নতুনভাবে সাজায়। তারের বদলে সে ব্যবহার করে তার বাবার ধনুকের ছিলা, মায়ের চুলের একটি তাগা এবং নিজের চুলের একটি অংশ। এই তিনটি জিনিস দিয়ে বাদ্যযন্ত্র বেঁধে যখন সে সুর তোলে, তখন গ্রামের মৃত মানুষদের পবিত্র আত্মারা জাগ্রত হয়। কুবো চন্দ্ররাজাকে দেখায় যে মানুষের স্মৃতিই হলোÑ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জাদু, যা কোনোদিন ধ্বংস করা যায় না। গ্রামবাসীদের সম্মিলিত স্মৃতি ও কুবোর জাদুর আলোয় চন্দ্ররাজা তার সমস্ত ক্ষমতা হারিয়ে সাধারণ মরণশীল বৃদ্ধে পরিণত হয়, যার আগের কোনো স্মৃতি মনে ছিল না। গ্রামবাসীরা প্রতিশোধ না নিয়ে দয়া ও সহানুভূতির মাধ্যমে সেই বুড়োকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে।

চমৎকার এই গল্পটি দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আমেরিকান ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টপ-মোশন অ্যানিমেটেড ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র কুবো অ্যান্ড দ্য টু স্ট্রিংস-এ।  সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন ট্রাভিস নাইট এবং এর চিত্রনাট্য লিখেছেন মার্ক হেইমস ও ক্রিস বাটলার। এই অসাধারণ সিনেমাটি তৈরি করতে অ্যানিমেটরদের বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ কার্টুন নয়, এটি একটি স্টপ-মোশন অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। এর মানে হলো, সিনেমার প্রতিটি চরিত্র আসলে ছোট ছোট পুতুল, যেগুলোকে হাত দিয়ে মিলিমিটার করে নাড়িয়ে প্রতিটি ফ্রেমের ছবি তোলা হয়েছে। লাইকা স্টুডিওর দক্ষ কারিগরেরা আধুনিক থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির সাহায্যে কুবো এবং অন্যান্য চরিত্রের লাখ লাখ নিখুঁত মুখের অভিব্যক্তি তৈরি করেছিলেন, যাতে তাদের আবেগকে একদম সত্যিকারের মানুষের মতো মনে হয়। সিনেমার হ্রদের ভেতরের দৃশ্য এবং সেই দানবীয় কঙ্কালের পুতুলটি ছিল স্টপ-মোশন ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও জটিল সেট।  যদিও সিনেমাটি বক্স অফিসে খুব বেশি টাকা আয় করতে পারেনি, তবুও এটি বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র সমালোচকদের মন জয় করে নিয়েছে এবং বাফটা পুরস্কারসহ অস্কারেও সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র হিসেবে মনোনীত হয়েছিল। এই সিনেমাটি আমাদের শেখায় যে, মানুষ মারা গেলেও তাদের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে এবং সেই ভালোবাসার স্মৃতিই হলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। একই সঙ্গে, সিনেমার শেষ দৃশ্যটি আমাদের এই সুন্দর শিক্ষা দেয় যে, হিংসা বা প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমাই মানুষের সবচেয়ে মহৎ গুণ।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!