ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সেলাইয়ের ফাঁকে স্বপ্ন বোনা কবির গল্প

জুয়েল হাসান
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে শহরের টিনের চালে এসে পড়ে, তখন কোথাও এক কোণে টকটক শব্দে জেগে ওঠে একটি সেলাই মেশিন। সেই শব্দ কেবল কাপড় জোড়ার নয়, জীবনের ছিন্ন অংশগুলোকে গেঁথে নেওয়ারও। সুইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে যেমন কাপড়ে নকশা ওঠে, তেমনি এক মানুষের বুকের ভেতরেও জন্ম

নেয় অক্ষরের বুনন। ঝিনাইদহের এক ছোট্ট দর্জির দোকানে বসেই এমন স্বপ্ন বোনেন কবি সজল রায়। ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকু-ু উপজেলার মাটিতেই তার জন্ম। শৈশব কেটেছে গ্রামবাংলার সহজ-সরল পরিবেশে। কাঁচা রাস্তা, সবুজ ধানখেত আর সন্ধ্যার আকাশভরা তারাÑ এসবই ছিল তার বড় হয়ে ওঠার সঙ্গী। তবে জীবনের প্রয়োজনে শিকড় ছেড়ে তাকে আসতে হয়েছে শহরে। বর্তমানে ঝিনাইদহ শহরের পুরাতন হাটখোলার চাকলাপাড়ায় একটি ছোট্ট দর্জির দোকানই তার জীবনযুদ্ধের কেন্দ্র।

এসএসসি পাশ সজল রায় পেশায় একজন দর্জি। এই পেশা তিনি শিখেছেন বাবার কাছ থেকে। বাবার হাত ধরেই সুই-সুতোয় প্রথম পরিচয়। তাই সেলাই তার কাছে শুধু আয়ের মাধ্যম নয়, এক ধরনের উত্তরাধিকার। ছোট্ট দোকান, সামান্য সরঞ্জামÑ কিন্তু কাজের মানে তিনি আপস করেন না। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, আমার কাজের মান ভালো বলেই দূর-দূরান্ত থেকে কাস্টমার আসে।’ কথাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকে শ্রমের গর্ব, সততার দীপ্তি।

তার সংসারও ছোটÑ স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে, যে ক্লাস টেনে পড়ে। আয় সীমিত, চাহিদা অসীম তবুও অভাবকে তিনি পরাজয় হতে দেন না। গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে বাসা নেওয়ার পেছনে একটাই স্বপ্নÑ ছেলের ভালো পড়াশোনা। তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষাই ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেয়। নিজের কষ্টকে তাই হাসিমুখে গ্রহণ করেন, যেন ছেলের পথটা একটু মসৃণ হয়।

কিন্তু সজল রায়ের পরিচয় এখানেই শেষ নয়। তিনি কবিও। দিনের ব্যস্ততার ফাঁকে, সেলাই মেশিনের একঘেয়ে শব্দের ভেতরেই জন্ম নেয় তার কবিতার পঙ্ক্তি। কখনো গ্রামবাংলার স্মৃতি, কখনো জীবনের সংগ্রাম, কখনো স্বপ্নের আলোÑ সবই তার কবিতায় ধরা পড়ে। নিয়মিত পড়াশোনা করেন, সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান। তার কয়েকটি কবিতা এরই মধ্যে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। এই স্বীকৃতি তার কাছে বড় প্রাপ্তিÑ নীরব অথচ গভীর আনন্দের।

স্বপ্নের কথা বললে তার চোখে ঝিলিক দেখা যায়। বলেন, অর্থনৈতিকভাবে আরেকটু সচ্ছল হলে দোকানটা আরও সুন্দর করে সাজাব, কাজটা আরও গোছানো করব। স্বপ্নটি হয়তো বড় নয়, কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে আত্মসম্মান আর উন্নতির আকাক্সক্ষা। তিনি জানেন, ধীরে ধীরে এগোতে হয়, তবেই পথ টেকে।

সংগ্রামকে সঙ্গী করেই সজল রায় ভালো আছেন। অভাব আছে, কিন্তু হতাশা নেই। সুই-সুতো, বই-খাতা আর কবিতার খাতাÑ এই তিনের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের এক জগৎ। তার গল্প আমাদের শেখায়, মানুষ ছোট হতে পারে, স্বপ্ন নয়। নীরব পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে, সেলাইয়ের ফাঁকেও কবিতা জন্ম নেয়Ñ আর জীবনের কাপড়ে জেগে ওঠে আশার নকশা।