স্বপ্ন এবং বাস্তবতার যখন মেলবন্ধন ঘটে, তখন জন্ম নেয় এক সফল উদ্যোক্তার গল্প। আজ আমাদের সঙ্গে আছেন এমন একজন ফ্যাশন উদ্যোক্তা, যার শৈশব কেটেছে কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে নতুন নকশা আঁকার নেশায়। পরিবারের সিদ্ধান্তে বিবিএ পড়লেও, মনের কোণে পুষে রাখা ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের স্বপ্নকে তিনি মরতে দেননি। বরং বিবিএ’র ব্যাবসায়িক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আজ তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের ফ্যাশন ব্র্যান্ড। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে এখন যার রয়েছে নিজস্ব শোরুম। চলুন আজ আমরা কথা বলি স্বপ্নজয়ী উদ্যোক্তা তমার সঙ্গে, যিনি প্রমাণ করেছেন ইচ্ছে থাকলে সাফল্যের নকশা নিজেই তৈরি করা যায়। ফ্যাশন উদ্যোক্তা তমা রাজ সাফল্যের গল্প জানাচ্ছেন রূপালী বাংলাদেশকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন
ছোটবেলা থেকেই নিজের পোশাক নিজে ডিজাইন করার যে নেশা ছিল, সেই ‘ডিজাইনার তমা’ হয়ে ওঠার শুরুর দিনগুলোর কথা যদি কিছু বলতেন।
ছোট থেকেই সুন্দর পোশাক পরার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল বেশি, যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন বাবা-মা পছন্দ করে ড্রেস কিনে দিত, আর যখন বুঝতে শিখলাম কাপড় চিনতে শিখলাম ঠিক তখন নিজেই নিজের পোশাকগুলো ডিজাইন করা শুরু করলাম। অবশ্যই আমি বলব আমার আগ্রহের কারণেই আমার এই প্রফেশন গড়ে উঠেছে, আর আমার প্রফেশনটা কখনোই আমার কাছে বোরিং ফিল হয় না কেননা এটা আমার নিজের পছন্দ করা ও ভালো লাগার কাজ।
এইচএসসির পর যখন আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবিএ-তে ভর্তি হতে হলো, তখন মানসিকভাবে নিজেকে কীভাবে সামলেছিলেন?
নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে যখন ভর্তি হয়েছিলাম তখন কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু আমি কখনোই আশাহত হইনি, কেননা আমার মনে ইচ্ছাশক্তি ছিল অনেক।
আপনি বিবিএ পড়েছেন, আবার ফ্যাশন ডিজাইনিং কোর্সও করেছেন। এই দুই বিপরীতমুখী পড়াশোনা আপনার ব্যাবসায়িক সাফল্যে কতটা ভূমিকা রেখেছে?
বিবিএ ও ফ্যাশন ডিজাইনিং আমার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ ফল দিচ্ছেÑ সেটা আমি এখন বুঝতে পারি। কেননা যেহেতু আমি একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছি বিবিএ’র সব বিষয় ও কারিকুলামগুলোর মধ্যেই কি করে একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়া যায় সেটা শেখানো হয়, যেটা এখন এসে আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটা আরও ভালো করে চালানোর জন্য সহযোগিতা করছে। আর ফ্যাশন ডিজাইনিং সেটা তো আমার স্বপ্ন ছিল, যেহেতু কাপড় নিয়ে ব্যবসা ফ্যাশন ডিজাইনিং থেকে আমি কাপড়ের ধরন, পোশাকের প্যাটার্ন ও সময়োপযোগী পোশাক নির্বাচন সাহায্য করে।
ইউনিভার্সিটির মেলায় যখন আপনার ডিজাইন করা পোশাকগুলো প্রদর্শিত হতো, তখনকার অনুভূতি কেমন ছিল? শিক্ষকদের উৎসাহ আপনাকে কতটা বদলে দিয়েছিল?
প্রথমত, একটা কথাই আমি বলতে চাই আমার শিক্ষকদের অনেক বড় ভূমিকা ছিল আমার এই উদ্যোগ হওয়ার পেছনে। আমার ডিপার্টমেন্টের ফিমেল টিচার আমাকে অনেক বেশি উৎসাহিত করতেন এবং আমার ডিজাইন করা পোশাকগুলো তারা পছন্দ করতেন, পোশাক প্রদর্শনী হলে তারা আমার কাছ থেকে সব সময় কেনাকাটা করতেন, এখনো অনেক টিচার আছেন যারা অনলাইনে আমার লাইভ দেখে জামা-কাপড় কেনাকাটা করেন।
ঢাকায় নারী উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? সেখান থেকে পাওয়া কোনো বিশেষ শিক্ষা যা আপনার শোরুম দেওয়ার ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে?
নারী উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করে আমি অনেক কাছ থেকে নারী কাস্টমারদের দেখেছি ও বুঝেছি তারা কেমন পোশাক চান ও কেমন পোশাক পছন্দ করেন। কাছাকাছি অনেক নারীর সঙ্গে মতবিনিময় হওয়ায় আমি বুঝতে পেরেছি কেমন ধরনের পোশাক আনলে তারা পছন্দ করবেন ও আমার একটা সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত হবে।
শোরুম দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেন নিলেন? অনলাইন থেকে অফলাইনে আসার চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল?
শোরুম দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার মায়ের, তিনি আমার কাজগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাই তিনি সবসময় আমাকে উৎসাহ দিতেন, যাতে আমি একটা শোরুম নেই। সে-অনুযায়ী ২০২৩ সালে আমি পেয়ে যাই। আর আমার মায়ের আগ্রহে শোরুম দিতে সফল হই।
আপনার বাবা শুরুতে অনলাইন লাইভ পছন্দ করতেন না, কিন্তু এখন তিনি নিজেই খুব আগ্রহী। এই বিবর্তনটা আপনার কাজের গতি কতটা বাড়িয়ে দিয়েছে?
এই বিষয়টা আমাকে সব সময় অনেক বেশি ভাবায়, আরও বেশি সামনের দিকে অগ্রসর করে, যেহেতু আমার বাবা কখনোই লাইন প্লাটফর্মটা পছন্দ করত না তাই তিনি সবসময় না করতেন কিন্তু যখন দেখলেন আমার মধ্যে আসলেই প্রতিভা আছে আর মানুষ আমার কাজগুলো পছন্দ করছেন তখন তিনি এ ব্যাপারে আমাকে আরও উৎসাহিত করতে লাগলেন। এখন মজার ব্যাপার হলো আমি যখন মাঝেমধ্যে লাইভ করি না তখন তিনি আমাকে ফোন দিয়ে জানতে চান কেন আমি লাইক করিনি বা কোনো সমস্যা কিনা।
পরিবারের অমতে শুরু করা এই জার্নিতে তাদের মন জয় করার মুহূর্তটি নিয়ে কিছু বলুন।
আসলে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারলে কখনোই কেউ পাশে দাঁড়ায় নাÑ এটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমি, আমার পরিবার আমার বাবা-মা শ^শুর-শাশুড়িÑ সবাই এখন আমার এই এগিয়ে যাওয়া দেখে খুব আনন্দিত হন এবং তারা বুঝতে পারেন সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও একই কাজ পারে। আমি আমার কাজের মাধ্যমে আমার পরিবারের সব সদস্যের মনে এতটাই জমাতে পেরেছি তারা চোখ বন্ধ করে আমার সব কথায় সায় দেন।
আপনার শোরুমে দেশি, ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানিÑ সব ধরনের কালেকশন আছে। এই ভিন্ন সংস্কৃতির পোশাকের ভিড়ে আপনার নিজস্ব ডিজাইনের ‘ইউনিক’ বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
আমার পোশাক প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু সব বয়সি নারীকে টার্গেট করে তাই আমি সব ধরনের ড্রেস রাখতে পছন্দ করি, আর এই সব বিদেশি ড্রেসের বাইরেও যারা রুচিশীল ও নান্দনিক পোশাক পরতে পছন্দ করেন তারা আমার ডিজাইনগুলো বেছে নেন।
কাস্টমাররা ঠিক কোন বিষয়টির জন্য বারবার আপনার শোরুমে ফিরে আসেন বলে আপনি মনে করেন?
আমার প্রতিষ্ঠানে বিদেশি যে পোশাকগুলো আছে সেগুলোর প্রাইজ আমি খুব সীমিত রাখার চেষ্টা করেছি যেটা অন্য শোরুমের সঙ্গে কম্পেয়ার করার মতো। তাই যারা একবার আমার শোরুম থেকে ইন্ডিয়ান অথবা পাকিস্তানি কোনো ড্রেস নেন তারা বারবার ফিরে আসেন। আর ইন্ডিয়ান যে পোশাকগুলো আমি সরাসরি ইন্ডিয়া থেকে ইমপোর্ট করি। মধ্যবর্তী কোনো পার্টি না থাকায় তুলনামূলক অন্যদের চেয়ে দাম কম রাখতে পারি।
ভবিষ্যতে কি নিজের কোনো সিগনেচার ফ্যাশন ব্র্যান্ড বা লাক্সারি কালেকশন নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে?
আমি যতদিন আমার কর্মজীবন কন্টিনিউ করব আশা করি এই ব্যবসার ওপর ভিত্তি করেই আমার কর্মজীবন অতিবাহিত করব। প্রতিনিয়ত আমি এই ব্যবসা নিয়ে নতুন নতুন চিন্তাভাবনা করি কোন পোশাকগুলো কাস্টমাররা আরও বেশি পছন্দ করবেন সেটা নিয়ে প্রতিনিয়তই কাজ করি। সামনে আমার এই ব্যবসা আরও বড় করার ইচ্ছা আছে ও ব্রাইডাল কালেকশন এড করার চিন্তাও রেখেছি।
যেসব তরুণী পরিবারের চাপে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে বসেছে, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী হবে?
প্রথমত, আমি এটাই জানিÑ স্বপ্ন কখনো নষ্ট হয় না বা কাউকে দায়ী করে নিজের স্বপ্নকে নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয়। আত্মবিশ্বাস থাকলে অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব। আর যে কাজে আপনার অভিজ্ঞতা আছে বা পছন্দের কাজের সম্পর্কে নিত্যনতুন তথ্য সংগ্রহ করতে হবে ও নতুন নতুন জিনিস শেখার চেষ্টা করতে হবে। এই চেষ্টা যতদিন থাকবে আপনার স্বপ্ন ততদিন বেঁচে থাকবে। তাই প্রতিনিয়তই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেটাকে আরও অগ্রসর করার জন্য নতুন নতুন কাজ শিখতে হবে।

