ছয় মাস বয়সে মাকে হারিয়েছেন। মায়ের মুখটা কেমন ছিল তার কোনো স্মৃতি নেই, এমনকি দেখার মতো একটি ছবিও নেই। জীবনের এই কঠিন শূন্যতা নিয়ে যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই উচ্চমাধ্যমিকের প্রথম বর্ষে হারাতে হয় বাবাকে। এতিম এক কিশোরের জীবনযাত্রা সেখানেই থমকে যেতে পারত। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বড় ভাইয়ের প্রেরণায় সব ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে তিনি আজ দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের পরিচিত নাম। বলছিলাম ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটির এডমিশন এন্ড ইনফরমেশন ডিরেক্টর আব্দুল গাফফার হিরকের কথা।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার এক অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে এসে আজ তিনি রাজধানী ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতি নির্ধারণী ও ব্র্যান্ডিং পর্যায়ের অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ দুই দশকের কর্মজীবনে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি আর শেখার মানসিকতা থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা জয় করা সম্ভব।
কমলগঞ্জ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর ঢাকায় এসে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। কর্মজীবনে প্রবেশের পরও তার পড়াশোনা থামেনি। পরবর্তীতে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট, স্টুডেন্ট সাইকোলজি ও ইউনিভার্সিটি ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে পিএইচডি করছেন। নিজেকে এখনো একজন সাধারণ ছাত্র ভাবতেই বেশি ভালোবাসেন তিনি। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষার যে বাণী, তা নিজের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন। তার ইচ্ছে, এই পিএইচডি শেষ করে পরবর্তীতে অন্য কোনো বিষয়ে পোস্ট ডক্টরেট করা। আজীবন নিজেকে পড়াশোনা ও নতুন কিছু শেখার মধ্যেই যুক্ত রাখতে চান তিনি।
পেশাগত জীবনের শুরুটা হয়েছিল ২০০৬ সালে ব্র্যাকের এডুকেশন সাপোর্ট প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। এরপর ২০০৮ সালে একটি অ্যারোনটিক্যাল কলেজে ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। কাজের প্রতি তার একাগ্রতা ও উদ্যম দেখে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে চীফ কো-অর্ডিনেটর এবং হেড অব এডমিশনের মতো বড় দায়িত্ব দেয়। সেখানে কাজ করার সময় তিনি বুঝতে পারেন, যেহেতু তিনি নিজে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নন, তাই দীর্ঘমেয়াদে এই খাতের মূল চালকের আসনে থাকা হয়তো সম্ভব নয়। তবে নিজের দায়িত্বে কোনো ছাড় দেননি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে সবগুলো আসন পূর্ণ করার কঠিন কাজটি সফলভাবে করেছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন এবং নিজ যোগ্যতায় সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। সেখানে তিনি প্রায় দশটি প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে পুরো গ্রুপের প্রশাসনিক ও ভর্তি কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন। শ্রেণিকক্ষে সরাসরি শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অভিজ্ঞতা তাকে পরবর্তীতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে দারুণ সাহায্য করেছে। শিক্ষার্থীরা কী চায় এবং অভিভাবকরা কী ভাবেন, তা খুব কাছ থেকে দেখার কারণেই তার পক্ষে একাডেমিয়া ও এডমিনিস্ট্রেশনের মাঝে সঠিক সেতুবন্ধন তৈরি করা সহজ হয়েছে।
আব্দুল গাফফার হিরকের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় দিক হলো, প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন বা কঠিন বিষয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কাজ করার সময় ইসিই (ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং নীটওয়্যার ম্যানুফেকচার অ্যান্ড টেকনোলজি (কেএমটি) বিষয়ের মতো অপেক্ষাকৃত অপরিচিত সাবজেক্টের সফল ব্র্যান্ডিং করেছিলেন তিনি।
২০২০ সালে সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তিনি বাংলা সম্মান কোর্স চালুর উদ্যোগ নেন। অনেকেই ভেবেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়ার শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না। কিন্তু মাতৃভাষার সঠিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি শতভাগ আসনে শিক্ষার্থী ভর্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে এডমিশন, প্রমোশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট-এর ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিয়ে অর্থনীতি বিভাগের ক্ষেত্রেও একই রকম সাফল্য দেখান। বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটিতেও তিনি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে কাজ করে যাচ্ছেন।
নিজ এলাকার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে গুণগত শিক্ষার প্রসারে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘আদমপুর ইউনাইটেড কলেজ’। নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত এবং সিলেট শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত এই কলেজটিতে তিনি প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
‘আমি সবাইকে সমান শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার চোখে দেখি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এই ঘোষণাটি কেবল তার কথার কথা নয়, দৈনন্দিন কাজেরও অংশ। কর্পোরেট জগতের কাঠখোট্টা আবহেও তিনি এই মানবিক দর্শনে অবিচল। তার মতে, প্রার্থনায় যেমন কোনো উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ থাকে না, কর্মক্ষেত্রেও সবার সম্মান সমান। তাই অফিসে আসা অতিথি বা শিক্ষার্থীদের আপ্যায়নের ক্ষেত্রে তিনি কখনোই প্রতিষ্ঠানের বাজেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন না। নিজের কষ্টার্জিত টাকায় মানুষকে আপ্যায়ন করেই তিনি সত্যিকারের তৃপ্তি পান। প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরে গিয়েও তিনি শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করেন এবং অনেক অসচ্ছল কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে শুধু সনদের ওপর নির্ভর না করে ল্যাব ও ইন্ডাস্ট্রিভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়ে পড়ছে, ছাত্রাবস্থাতেই যেন শিল্পের সাথে তার সরাসরি সংযোগ ঘটে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ ও পিএইচডি চালুর পক্ষে তার অবস্থান। তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শুধু ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজের ইচ্ছা, চেষ্টা ও প্যাশনকে গুরুত্ব দিতে হবে। মেধা ও সঠিক মানসিকতা থাকলে পড়াশোনার ট্র্যাক বদলে ফেলে নতুন কর্মক্ষেত্রেও শীর্ষস্থান অর্জন করা সম্ভব। আব্দুল গাফফার হিরকের এই নিরলস পথচলা ও নিজেকে গড়ার গল্প নিঃসন্দেহে দেশের হাজারো তরুণের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।

