ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বরফ প্রদেশে বাংলাদেশির স্বপ্ন

জাহিন ফেরদৌসী খান
প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০৬:৪২ এএম

ঈদের মাসখানেক পড়ই সম্ভবত আমার উড়াল। প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ শেষ করে, মায়ের চোখের কোণের পানি মুছে দিয়ে আমি রওনা হব এক দূরদেশেÑ কানাডার আলবার্তা প্রদেশে। গন্তব্য ইউনিভার্সিটি অব আলবার্তা। সেখানে আমি এমবিএ পড়তে যাচ্ছি। এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত উচ্চশিক্ষার নয়; এটি আমার স্বপ্ন, আমার দেশের পরিচয়কে নতুন করে তুলে ধরার এক সংকল্পেরও যাত্রা।

ইউনিভার্সিটি অব আলবার্তা বাংলাদেশের তরুণদের কাছে আজ এক প্রতীকÑ গবেষণার, বৈশ্বিক নাগরিকত্বের এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রস্তুতি, অধ্যবসায় ও সঠিক তথ্য। একই সঙ্গে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি যাতে বিদেশে অর্জিত জ্ঞান একদিন দেশের উন্নয়নের স্রোতে মিশে যায়। বরফের দেশে যে আলো জ্বলে, তা যদি একদিন বাংলার আকাশেও প্রতিফলিত হয় তবেই এই যাত্রা পূর্ণতা পাবে।

১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি অব আলবার্তা আজ কানাডার শীর্ষ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। এডমন্টন শহরের নর্থ সাসকাচুয়ান নদীর তীরে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাস জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের এক প্রাণকেন্দ্র। প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, জ্বালানি গবেষণার পাশাপাশি ব্যবসায় শিক্ষায়ও প্রতিষ্ঠানটির সুনাম সুদূরপ্রসারী। এর অষনবৎঃধ ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ইঁংরহবংং কানাডার স্বীকৃত ও প্রতিযোগিতামূলক বিজনেস স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে বৈশ্বিক বাণিজ্য, উদ্ভাবন, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা-চিন্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্বের উন্নত আরও কয়েকটি দেশের ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করেছিলাম। সবটিতেই আমি ভর্তির জন্য যোগ্য বা নির্বাচিত হয়েছি। কিন্তু আমার স্বপ্ন ইউনিভার্সিটি অব আলবার্তা। আমি যখন এখান থেকে পাঠানো ভর্তির চিঠিটি (মেইল) হাতে পাই, মনে হয়েছিলÑ এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নয়; এটি এক নতুন দায়িত্বের সূচনা। বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি জানি, বিদেশে পড়তে যাওয়া মানে কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়া নয়; বরং নিজের দেশকেও বহন করে নিয়ে যাওয়া।

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে উত্তর আমেরিকা। আলবার্তা প্রদেশ নিজেই জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এখানে ব্যবসায় শিক্ষা মানে কেবল তত্ত্ব শেখা নয়; বরং শিল্প-সংযুক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

আলবার্তা স্কুল অব বিজনেসের এমবিএ প্রোগ্রামে কেস-স্টাডিভিত্তিক শিক্ষা, করপোরেট ইন্টার্নশিপ, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ থাকবেÑ যা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়ক।

ভর্তির প্রক্রিয়াও ছিল চ্যালেঞ্জিং। একাডেমিক রেকর্ড, ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ (ওঊখঞঝ), স্টেটমেন্ট অব পারপাস, রেফারেন্স লেটারÑ সব মিলিয়ে দীর্ঘ প্রস্তুতির পথ। সেই পথ পেরিয়ে যখন নিশ্চিত হলাম, বুঝলামÑ স্বপ্নের পথে পরিশ্রমই একমাত্র পাসপোর্ট।

আমি বিশ্বাস করি, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির সিঁড়ি নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধের সুযোগ। কানাডায় বাংলাদেশের পরিচিতি এখনো সীমিত পরিসরে আবদ্ধÑ মূলত প্রবাসী সম্প্রদায় ও কিছু নির্দিষ্ট খাতে। কিন্তু আমাদের সম্ভাবনা বহুমাত্রিকÑ তরুণ জনগোষ্ঠী, উদীয়মান অর্থনীতি, তৈরি পোশাক শিল্প, আইটি খাত, কৃষি ও সামাজিক উন্নয়ন সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক উদীয়মান শক্তি।

আমার স্বপ্ন, এমবিএ শেষে আমি এমন এক অবস্থানে পৌঁছাতে চাই, যেখানে কানাডার ব্যাবসায়িক পরিম-লে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরতে পারি। দুই দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সহযোগিতা, বিনিয়োগের সুযোগ, প্রযুক্তি বিনিময় এসব ক্ষেত্রেই কাজ করতে চাই। আমি চাই, কানাডার কোনো বোর্ডরুমে যখন দক্ষিণ এশিয়ার বাজার নিয়ে আলোচনা হবে, তখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হোক সম্ভাবনার ভাষায়।

এডমন্টনে ছোট হলেও সক্রিয় বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে। নববর্ষ, ভাষা দিবস, বিজয় দিবসÑ সবই উদযাপিত হয় প্রবাসের মাটিতে। আমি সেখানে শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, একজন সাংস্কৃতিক দূত হিসেবেও নিজেকে দেখতে চাই।

আমি চাই, আমার সহপাঠীরা জানুকÑ বাংলাদেশ মানে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর নয়; এটি এক প্রাণবন্ত সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত ও সংগ্রামের ইতিহাসের দেশ। আমরা ভাষার জন্য জীবন দেওয়া জাতি, আমরা অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর এক উদাহরণ। তবে স্বপ্নের পথ সহজ নয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি ও জীবনযাপনের খরচ উল্লেখযোগ্য। আলবার্তার শীত দীর্ঘ ও কঠিন; নতুন সংস্কৃতি ও একাডেমিক চাপও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু প্রতিটি চ্যালেঞ্জই একেকটি শিক্ষার ধাপ। আমি জানি, মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয়, আত্মীয়দের দোয়া, শিক্ষকদের আশীর্বাদÑ এসবই আমার সঙ্গে থাকবে। ঈদের আনন্দ শেষে বিমানবন্দরের বিদায়ের মুহূর্তে হয়তো আবেগে ভেসে উঠব, কিন্তু সেই আবেগই হবে আমার শক্তি।

বিদেশে পড়তে যাওয়া নিয়ে দেশে প্রায়ই ‘ব্রেইন ড্রেইন’-এর আলোচনা হয়। কিন্তু আমি এটিকে দেখতে চাই ‘ব্রেইন কানেক্ট’ হিসেবেÑ মেধার সংযোগ। যদি আমরা বৈশ্বিক জ্ঞান ও নেটওয়ার্ক অর্জন করে দেশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারি, তবে তা হবে শক্তি। আমার লক্ষ্য স্থায়ীভাবে যেখানেই থাকি না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পেশাগত ও ব্যাবসায়িক সংযোগ অটুট রাখা। হয়তো ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলব, হয়তো কোনো যৌথ উদ্যোগের সেতুবন্ধ করবÑ এই স্বপ্নই আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

ইউনিভার্সিটি অব আলবার্তা আমার কাছে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আত্মবিশ্বাসের আরেক নাম। বরফে ঢাকা সেই ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আমি হয়তো ভাববÑ একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন কতদূর যেতে পারে। সেই যাত্রা তাই কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব পাড়ি দেওয়া নয়; এটি স্বপ্ন, দায়িত্ব ও পরিচয়ের এক নতুন অধ্যায়। আমি বিশ্বাস করি, আলবার্তার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমি যখন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ব, তখন অদৃশ্যভাবে সঙ্গে থাকবে লাল-সবুজের পতাকা। বরফের দেশে যদি আমি একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে পারি বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা বলে, তার সাফল্যের গল্প শুনিয়ে তবে এই যাত্রাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।