ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

২৪ বছরের মধ্যে বেসরকারি ঋণে সর্বনিম্ম প্রবৃদ্ধি

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৬:৩৩ এএম

বহুমুখী সংকটে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমেছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনি¤œ ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যাবসায়িক আস্থা কমে যাওয়া, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার প্রতিফলন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। তাদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবসা কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করার গভীর সমস্যাগুলো এখনো সমাধান হয়নি। এ ছাড়া মার্চ মাসে জ¦ালানি সংকট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা দেয়, যার ফলে আগের তুলনায় ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত কমে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ডিসেম্বরে তা নেমে আসে ৬ দশমিক ২০ শতাংশে। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সেটি ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে স্থির থাকে, তবে মার্চে এসে তা হঠাৎ করেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে বেসরকারি খাতে মোট আউটস্ট্যান্ডিং লোনের (ঋণের স্থিতি) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ করে আসছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৪ বছরের মধ্যে চলতি বছরের মার্চ মাসে সর্বনি¤œ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চালু আছে সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। তিনি জানান, নাসা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ ও গাজী গ্রুপসহ বড় বড় ব্যাবসায়িক গ্রুপের একাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে ব্যাংক ঋণের চাহিদা কমেছে। তিনি বলেন, ‘কারখানাগুলো চালু থাকাকালে তারা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করত। কিন্তু এখনো যেসব প্রতিষ্ঠান চালু আছে, তাদের উৎপাদনও ৬০-৭০ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকাররা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সংকটকালীন ট্রেড ফাইন্যান্সে সুদের হার ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ‘সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট’-এর (এসওএফআর) সঙ্গে ২ দশমিক ৫ শতাংশ যোগ করে। আর ইউপাস, যা বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক আমদানি অর্থায়নের একটি ব্যবস্থাÑ এ অতিরিক্ত সীমা আরোপ অর্থায়নের সুযোগ আরও সীমিত করবে। তিনি বলেন, ‘যদি ইউপাসের মাধ্যমে অর্থায়ন কঠিন হয়ে যায়, তবে ব্যাংকগুলোকে স্থানীয় মুদ্রায় ১২-১৩ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে, এ জন্য ট্রেড ফাইন্যান্সের সুদের হার কমানো হয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সঠিক নয়, এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত।’

বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো আয় বাড়াতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দিকে বেশি ঝুঁকছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে ব্যাংকগুলো নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকছে। একই সময়ে সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ব্যাপক ঋণ নিচ্ছে, যার মধ্যে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নিয়মিত ঋণসূচির বাইরে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সীমিত বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগের কারণে ব্যাংকগুলো কার্যত ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে প্রায় ১১ শতাংশ সুদ আয় করছে। অনেক প্রচলিত ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ এখন এই খাত থেকেই আসছে। ২০২৫ সালের শুরুতে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল ঋণ চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংকগুলো মূলত ঋণ সম্প্রসারণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয়ের মাধ্যমে বেশি মুনাফা করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এপ্রিলে তা মাসিক ভিত্তিতে ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পূর্বে ইস্যুকৃত ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। ফলে এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকায়।