ভোরবেলা জানালার কার্নিশে এসে বসা পাখিটার ডাক কখনো খেয়াল করেছেন? ধোঁয়া ওঠা চা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বুকভরে অনুভব করেছেন সতেজ বাতাস? আমরা খেয়াল না করলেও, জীবন আসলে এসব ছোট ছোট মুহূর্তগুলোরই চমৎকার এক কোলাজ। অথচ আমরা সারাক্ষণ কেমন যেন ইঁদুরদৌড়ে লিপ্ত। সাফল্যের পাহাড় গড়তে গিয়ে আমরা অজান্তেই হারিয়ে ফেলছি নিজেদের সত্তাকে। এত হতাশার মধ্যেও আশার কথা হলো, মানুষ এখন আর কেবল যান্ত্রিক উৎকর্ষে সন্তুষ্ট নয়। এক সময় ভালো থাকা মানে অনেক কিছু থাকা, এমন ট্রেন্ড থাকলেও বর্তমানে এসে ভালো থাকা বা ‘মননশীল জীবনযাপন’ নিজেই ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন চাকচিক্যের চেয়ে প্রশান্তিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যান্ত্রিকতার ভিড়ে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেতে বা নিজেকে ভালো রাখতে পারা যায় কীভাবে, তাই জানব চলুন-
ডিজিটাল ডিটক্স
বর্তমান সময়ে প্রায় সবারই দিন শুরু হয় স্মার্টফোনের নীল আলো দেখে, এবং দিন শেষ হয় অন্তহীন স্ক্রলিংয়ের ক্লান্তি নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন এবং অবিরাম তথ্যের প্রবাহ আমাদের মস্তিষ্কের ওপর দিন দিন যে চাপ তৈরি করছে, তাকে মনোবিজ্ঞানীরা কগনিটিভ ওভারলোড বলছেন। সময়ের ডিজিটাল দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে আধুনিক বিশ্বে এখন ডিজিটাল ডিটক্স একটি অপরিহার্য জীবনশৈলী। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম আমাদের ডোপামিন চক্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে মনোযোগের অভাব এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ডিজিটাল ডিটক্স মানে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা নয়, বরং এর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দিনের শুরুতে অন্তত এক ঘণ্টা ফোন থেকে দূরে থাকা এবং ঘুমানোর আগে ডিভাইসের বদলে কোনো বইয়ের পাতায় চোখ রাখা স্নায়ুকে শান্ত করে। অফিসের কাজ শেষে ফোনের ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোড চালু রাখা বিলাসিতা নয়, বরং মানসিক সুস্থতার জন্য এটি একটি লড়াই। সপ্তাহে অন্তত একদিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরতি নিয়ে সশরীরে মানুষের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া বা প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়্যারিংয়ে সাহায্য করে।
সেলফ-কেয়ার
দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল যে, সেলফ-কেয়ার মানে পার্লার বা দামি স্পা-তে সময় কাটানো। কিন্তু জীবনমুখী নতুন ট্রেন্ডে সেলফ-কেয়ারের অর্থ অনেক বেশি গভীর। সেলফ-কেয়ার মূলত নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। শরীর ও মনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে কোনো মানুষই দীর্ঘমেয়াদে সুখী বা উৎপাদনশীল থাকতে পারে না। পুষ্টিবিদ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক খাদ্যভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুমই হলো সেরা সেলফ-কেয়ার। শরীরের ভেতরটা যখন বিষমুক্ত থাকে, তখন মনের জানালাগুলোও আপনাআপনি খুলে যায়। এ ছাড়া নিজের পছন্দের ছোট ছোট কাজ- যেমন বৃষ্টিতে ভেজা, পছন্দের কোনো গান শোনা কিংবা স্রেফ বারান্দায় বসে আকাশ দেখা ইত্যাদি আমাদের শরীরে এন্ডোরফিন এবং সেরোটোনিন নামক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়। এটি আমাদের মানসিকভাবে চনমনে রাখে। নিজেকে ভালোবাসা মানে নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়া এবং প্রতিনিয়ত অন্যদের সঙ্গে নিজের তুলনা না করে নিজের ছন্দে চলা।
সলিটিউড বনাম লোনলিনেস
পাশ্চাত্য সমাজে সলিটিউড বা নির্জনতাকে এক ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়। অথচ আমরা প্রায়ই একে লোনলিনেস বা একাকিত্বের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। একাকিত্ব হলো বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা, অন্যদিকে নির্জনতা হলো নিজের সঙ্গ উপভোগ করার শিল্প। ভিড়ের মাঝে থেকেও মানুষ একা বোধ করতে পারে, আবার নির্জনতার মাঝেও খুঁজে পেতে পারে পরম আনন্দ।
একা সময় কাটানো মানে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। মাঝে মাঝে একা কোনো শান্ত ক্যাফেতে বসে কফি খাওয়া, জনাকীর্ণ রাস্তা দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটা বা নিজের কোনো শখের কাজ নিভৃতে করা যেকোনো মানুষের সৃজনশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যের প্রত্যাশার চাপ ছাড়া নিজের সঙ্গে সময় কাটালে আমাদের চিন্তাশক্তি আরও স্বচ্ছ হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যারা নিয়মিত নিজের সঙ্গে সময় কাটান, তাদের আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। এটি এক ধরনের মানসিক রিচার্জ, যা আমাদের সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জেওএমও
বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা ‘ফোমো’ (ঋঙগঙ-ঋবধৎ ড়ভ গরংংরহম ঙঁঃ) বা সব কিছুতে অংশ নেওয়ার এক অস্থিরতায় ভুগেছি। অন্যের জীবনের জৌলুস সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে নিজের জীবনের অপূর্ণতা নিয়ে হাহাকার করাই ছিল এর মূল উপজীব্য। তবে এর বিপরীতে এখনকার তরুণ ও মধ্যবয়সিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ‘জেওএমও’ (ঔঙগঙ-ঔড়ু ঙভ গরংংরহম ঙঁঃ)। এটি মূলত অপ্রয়োজনীয় সব ইভেন্টে বা ট্রেন্ডে অংশ না নিয়েও সুখী থাকার এক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
জেওএমও আমাদের শেখায়, সব নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হবে না, সব ভাইরাল ট্রেন্ডে নাচতে হবে না। বরং ঘরে বসে পরিবারের সঙ্গে নিভৃত সময় কাটানো বা একটি সাধারণ সন্ধ্যা উপভোগ করার মধ্যেও যে পরম তৃপ্তি আছে, তা উপলব্ধি করাই হলো জেওএমও। এটি মূলত জীবনের অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি সেট করার প্রক্রিয়া। অপ্রয়োজনীয় সামাজিকতা এড়িয়ে নিজের পছন্দের ছোট গ-িতে সীমাবদ্ধ থাকা মোটেও অসামাজিকতা নয়, বরং এটি জীবনের ভারসাম্য রক্ষার একটি শৈল্পিক কৌশল। তুচ্ছ বিষয়গুলোকে না বলতে শিখলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে।
অন্তরের প্রশান্তি
জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, জীবন মানে প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করা। ভালো থাকাই যখন ট্রেন্ডে পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে পৃথিবী এখন শুধু বাহ্যিক চাকচিক্যে সন্তুষ্ট নয়। ডিজিটাল ডিটক্স থেকে শুরু করে জেওএমও পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ই শেখায়, সুখের চাবিকাঠি আমাদের নিজেদের হাতেই। যান্ত্রিকতার এই প্রবল স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে মাঝে মাঝে একটু থমকে দাঁড়ানো, নিজের নিশ্বাসকে অনুভব করা, নিজেকে নিয়ে তৃপ্ত থাকাই হলো আসল জয়। দিনশেষে সুস্থ শরীর-শান্ত মনের চেয়ে দামি কোনো সম্পদ এই পৃথিবীতে নেই।
ঝটপট ভালো থাকার ৫টি উপায়
গ্যাজেট মুক্ত সকাল : ঘুম থেকে ওঠার প্রথম এক ঘণ্টা স্মার্টফোন স্পর্শ করবেন না।
গভীর শ্বাস : যখনই চাপ অনুভব করবেন, পাঁচ সেকেন্ড বুকভরে শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে ছাড়ুন।
ধন্যবাদ জানানোর অভ্যাস : প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো জিনিসের কথা মনে করুন যার জন্য আপনি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।
অল্পে তুষ্টি : সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনামূলক চিত্র থেকে দূরে থেকে নিজের জীবনের ছোট সাফল্যগুলো উদযাপন করুন।
মাটির সান্নিধ্য : সম্ভব হলে প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট সবুজ গাছপালার আশপাশে সময় কাটান। এটি স্নায়ুকে শিথিল করে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন