ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড 

নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদার টাকা ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব 

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৫:২২ এএম
রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

রাজধানীর পান্থপথসংলগ্ন তেজতুরী বাজার এলাকায় বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় কে বা কারা জড়িত সে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পাশাপাশি এই হত্যার ঘটনায় কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ২ শুটারসহ সন্দেহভাজন অপরাধীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশের ধারণা, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের জেরে বিএনপি নেতা মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন। তবে শুটারদের গ্রেপ্তারের পর এই হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য বের হয়ে আসবে বলে মনে করছে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, মুছাব্বির খুনের পর কারওয়ান বাজার থেকে বিএনপি ও যুবদলের নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যেসব চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করত, সেই চক্রটি এখন আত্মগোপনে চলে গেছে। তাদেরও সন্দেহের চোখে দেখছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, এই চক্রের অনেকের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই সুষ্ঠু তদন্ত ও সব কিছু আমলে নিয়ে মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে মাঠে সক্রিয় পুলিশ।

পুলিশি তথ্য মতে, হত্যাকারীরা ঘটনার আগেই ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে মুছাব্বিরকে নজরে রাখে। তবে গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা, মুছাব্বিরকে হত্যার মিশনে সরাসরি অংশ নেওয়া ২ যুবকের পাশাপাশি আরও অন্তত ১০ জন এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তদন্তকারী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বির হত্যার শিকার হতে পারে। তার বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণও পুলিশের কাছে রয়েছে। তিনি হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন ব্যবসায়ীরা।  সেখানে মুছাব্বিরের নাম ব্যবহার করে বেশ কয়েকজন ওই মানববন্ধনে হামলা করে। থানা পুলিশ ও গোয়েন্দারা বলছেন, এছাড়া আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরেও মুছাব্বির খুন হতে পারেন। এরই মধ্যে পলাতক ২ দুর্বৃত্তকে খোঁজা হচ্ছে। তারাসহ এই হত্যার ঘটনায় অন্তত ১০ জন জড়িত বলে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেছে। এদিকে বিএনপি নেতা মুছাব্বির হত্যার ঘটনায় সরেজমিনে ঘটনাস্থল ও কারওয়ান বাজারে গিয়ে জানা যায়, স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নিহত আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির। তিনি মারা যাওয়ার পরপর সংশ্লিষ্ট থানা ও কারওয়ান বাজার নিয়ন্ত্রণকারী চক্রের বিএনপির পদধারী নেতারা উধাও হয়ে গেছেন। কেউ কেউ মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন, কেউবা আবার ঢাকার বাইরে আছেন।

স্থানীয় একাধিক বিএনপি নেতা রূপালী বাংলাদেশের এই প্রতিবেদককে টেলিফোনে বলেন, আমরা অনেকেই এলাকার বাইরে। তাছাড়া এখন ঘর থেকে বের হতে আতঙ্ক মনে হচ্ছে। কেউবা দাবি করেন- কেন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেটার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে কারওয়ান বাজারে সিন্ডেকেট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বিএনপিপন্থি একাধিক নেতার সঙ্গে সরাসরি দেখা করে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে অধিকাংশ নেতা ঢাকার বাইরে আছেন অথবা এলাকার বাইরে রয়েছেন বলে ফোন কেটে দেন।

সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পাশাপাশি ২ যুবককে খোঁজা হচ্ছে :

পুলিশ জানায়, মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের সময় তার সঙ্গে থাকা আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আবু সুফিয়ান নামের ওই ব্যক্তিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুফিয়ান কারওয়ান বাজার ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ঘটনার পর আশপাশের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ এখন পর্যন্ত দুজন দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালাতে দেখেছে। আরও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি শুটারদের খোঁজা হচ্ছে।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম বলেন, বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে স্টার কাবাবের পেছনের একটি গলিতে মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত মুছাব্বির ওই এলাকায় বসবাস করতেন না। তিনি অন্য এলাকায় থাকতেন। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি মাঝেমধ্যে তেজতুরী বাজার এলাকায় যেতেন। নিরাপত্তার কারণে তার বাসার ঠিকানা প্রকাশ করা হচ্ছে না। এডিসি ফজলুল করিম আরও বলেন, এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবার একটি এজহারের আবেদন করেছেন। এজাহারে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।  যাচাই-বাছাই শেষে বিষয়টি ভালোভাবে জানানো যাবে। তবে হত্যাকা-ের নেপথ্যের কারণ জানতে সুষ্ঠু তদন্ত চলছে। কাউকে এই বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। 

মুছাব্বির হত্যায় যা দেখা গেল সিসি টিভি ফুটেজে :

স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মুছাব্বিরকে বুধবার রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন স্টার হোটেলের পেছনের গলিতে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তাকে গুলি করে দুর্বৃত্তদের পালিয়ে যাওয়ার সিসি টিভি ফুটেজ গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। ফুটেজে দেখা গেছে, মুছাব্বিরকে গুলি করার পর ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। জানা গেছে, মুছাব্বিরকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় দুর্বৃত্তরা ৫টি গুলি করে।  তার পেটে গুলি লাগে। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কফি খাওয়া হয়নি, নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন স্ত্রীসহ তিন সন্তান :

কারওয়ান বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত মুছাব্বিরকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন স্ত্রীসহ তিন সন্তান। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে তার পরিবার। নিহত মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম জানান, ‘ঘটনার আগে সন্ধ্যায় তিনি আমাকে বললেন, তুমি একটা কফি বানিয়ে দাও, আমি নামাজ পড়ে বের হব। ওইটাই শেষ কথা ছিল। তিনি যখন বাইরে যান প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া বাসায় ফোন দেন না।  আমার হাতের শেষ কফি খেতে চেয়েছিলেন তিনিÑ এটা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের পরিবারের সদস্যরা।’

বস্তা থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করতে থাকে দুর্বৃত্তরা : থানা পুলিশ সূত্র মতে, গত বুধবার রাত সোয়া ৮টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সিসি টিভিতে দেখা গেছে, হত্যাকা-ের পুরো দৃশ্য। এতে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে ছিল দুই দুর্বৃত্ত, স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মুছাব্বিরকে দেখামাত্র বস্তা থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করে তারা। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। জীবন বাঁচাতে আবার উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন মুছাব্বির।  এ সময় মুছাব্বিরের ফোন পড়ে যায়। শুটাররা সেই ফোন নিয়েই পালিয়ে যায়। এছাড়া মুছাব্বিরের সঙ্গে থাকা আবু সুফিয়ান মাসুদ নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

হত্যার ঘটনায় মামলা :

ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তার পরিবার থেকে অজ্ঞাত ৫ জনকে আসামি করে এই মামলা দায়ের করা হয়।  তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈন্যু মারমা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেছেন। ওসি বলেন, নিহত মুছাব্বিরের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এরপর তার মরদেহ রাজধানীর নয়পল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে জানাজার জন্য নেওয়া হয়। ওসি ক্যশৈন্যু মারমা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মুছাব্বির হত্যার মিশনে সরাসরি অংশ নেয় ২ শুটারসহ ১০ থেকে ১৫ জন। কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে খুন হয়েছে কি না সেটাও তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ছিল কি না, সেটা আমলে নিয়ে বিশেষ তদন্তে জোর দিচ্ছি। 

জানাজা সম্পন্ন :

সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে।  গতকাল বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, নিহতের আত্মীয়স্বজন এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।  এ সময় নেতারা সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

খুনিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি :

এদিকে বিএনপি নেতা মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল।  বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুছাব্বিরের জানাজার আগে স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইয়াসীন আলী ও সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এ হুঁশিয়ারি দিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেন।