× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সেলিম আহমেদ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ০৬:৫৩ এএম

প্রশ্নফাঁসে বিতর্কিত প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা

সেলিম আহমেদ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ০৬:৫৩ এএম

প্রশ্নফাঁসে বিতর্কিত প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা বিতর্ক। গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত হওয়া দেশের সবচেয়ে বড় এই সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা, ডিভাইস ব্যবহার ও প্রক্সি পরীক্ষা দেওয়ার অভিযোগে অন্তত ৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বহিষ্কার করা হয়েছে আরও ২০৭ জনকে। এর মধ্যে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার পাঁচজনকে তিন দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। এদিকে বিতর্ক ওঠায় এরই মধ্যে এই পরীক্ষা বাতিল করে দ্রুত পনুঃপরীক্ষা নেওয়ার জন্য আন্দোলনে নেমেছেন একদল চাকরিপ্রত্যাশীসহ রাজনৈতিক নেতা। গতকাল রোববার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন তারা। যদিও ডিপিই দাবি করছে, পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসহ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরীক্ষা নিয়ে এসব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও দ্রুত ফল প্রকাশের তোড়জোড় শুরু করেছে সংস্থাটি। তারা বলছে, চলতি মাসের মধ্যেই লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হবে।

গত শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া ৬১ জেলায় একযোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্য এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল গত ২ জানুয়ারি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও তার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পিছিয়ে ৯ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। দেশের ১ হাজার ৪০৮টি কেন্দ্রে  মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেন ১০ লাখের বেশি চাকরিপ্রার্থী। সে হিসাবে প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৭৫ জন প্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। প্রার্থী ও পদের সংখ্যার বিবেচনায় এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরকারি চাকরির পরীক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এবার পরীক্ষার আগেই প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একটি চক্র প্রশ্নফাঁসের প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকাও হাতিয়ে নেয় পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে। শেষমেশ গোয়েন্দা তৎপরতাসহ নিরাপত্তাব্যবস্থার কড়াকড়ির মধ্যে গত শুক্রবার এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘হিসাব সহকারী’ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে পরীক্ষা শুরুর মাত্র এক ঘণ্টা আগে বিনা নোটিশে তা স্থগিত করা হয়। এ নিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা একদিকে যেমন ক্ষোভ জানিয়েছেন, অন্যদিকে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জড়িত বলেও অভিযোগ তোলেন তারা।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে ২ জানুয়ারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হাওয়ার কথা ছিল বিধায় ২৫ ডিসেম্বর দেশের সব জেলায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রশ্নপত্র নিজ নিজ জেলা প্রশাসনের (ডিসি) ট্রেজারিতে জমা ছিল। সেখান থেকেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তুলেছেন পরীক্ষার্থীরা।

পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষার দুই দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের একটি অংশ থেকে হুবহু কয়েকটি প্রশ্ন পরীক্ষায় এসেছে। এতে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আরও জোরালো হয়। তাদের দাবি, ২৫ ডিসেম্বর প্রশ্নপত্র জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দেওয়ায় তা চক্রের হাতে চলে গেছে।

পরীক্ষার্থীদের ভাষ্য, উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় ডিভাইস পার্টি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সেখানে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বাড়ে। এর ফলে বিভিন্ন জেলায় শতাধিক পরীক্ষার্থীকে ডিভাইস ব্যবহার করে জালিয়াতির অভিযোগে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রশ্নফাঁসসহ পরীক্ষায় অসদুপায়ের দায়ে গাইবান্ধায় ৪৮ জন, কুড়িগ্রামে ১১ জন, দিনাজপুরে ১৭ জন, নওগাঁওয়ে ৯ জন, টাঙ্গাইলে পাঁচজন, ঢাকায় দুজন, গোপালগঞ্জে তিনজন, জামালপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে একজন করে মোট ৯৭ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদের মধ্যে কয়েকজন প্রক্সি পরীক্ষা দিতেও গিয়েছিলেন। আটকৃতদের কাছ থেকে ইলেকট্রনিকস ডিভাইস, মোবাইলফোন, ব্লুটুথ, মাস্টারকার্ড, প্রশ্নের ফটোকপিসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন আদালত। এর মধ্যে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানা শিক্ষা কর্মকর্তা নাইয়ার সুলতানার রাজধানী শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা মামলায় পাঁচজনকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গত শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিনা খন্দকার আন্নার আদালত রিমান্ডের এ আদেশ দেন। রিমান্ডে নেওয়া আসামিরা হলেনÑ বেল্লাল হোসেন, জয়নাল আবেদীন, অপূর্ব ব্যনার্জী, আনোয়ার হোসেন ও মো. আল আমিন।

এদিকে প্রশ্নফাঁস, ডিভাইস ব্যবহার, জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগের প্রতিবাদে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের দাবি তুলেছেন চাকরিপ্রত্যাশীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান ফটকে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন একদল নিয়োগপ্রত্যাশী। দুপুর ১২টা পর্যন্ত তারা অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পরীক্ষা বাতিলের দাবি তোলেন। এ সময় তারা পরীক্ষা বাতিল করে দ্রুত পরীক্ষা নেওয়াসহ পাঁচ দাবি জানান। দাবিগুলো হলোÑ সব চাকরির পরীক্ষা ঢাকায় নিতে হবে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে ডিভাইস চেকার ও নেটওয়ার্ক জ্যামার রাখতে হবে; স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করতে হবে এবং তার আওতায় সব পরীক্ষা নিতে হবে। একই দিনে একই সময়ে একাধিক পরীক্ষা নেওয়া যাবে না; যেসব প্রতিষ্ঠানে বিগত সালে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের রেকর্ড আছে, তাদের কোনোভাবেই প্রশ্ন প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না এবং প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার তথ্য প্রমাণিত হলে জড়িত সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং প্রশ্ন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে স্বেচ্ছায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ করতে হবে।

অন্যদিকে প্রশ্নফাঁস ও ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল এবং এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদও। গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এসব দাবি তুলে ধরে। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার বিতর্ক ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা হলো শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। প্রশ্নফাঁস ও ডিভাইসের মাধ্যমে অসাধু উপায়ে উত্তীর্ণদের দিয়ে শিশুদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই এই বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নিতে হবে।’

সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাহতাপ ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকেরা হবেন বিবেকবান মানুষ, সুশিক্ষায় শিক্ষিত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনেকেই প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে পরীক্ষা দিচ্ছেন, ডিভাইস পদ্ধতি ব্যবহার করে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এতে তারা তাদের নৈতিকতা হারিয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমরা মনে করি, যে পরীক্ষাটি হয়েছে, সেটি বাতিল করে পুনরায় নেওয়া প্রয়োজন। কেননা, এই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষায় পাস করে শিক্ষক হওয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’

এদিকে এত বিতর্কের মধ্যেও পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত প্রকাশ করতে তোড়জোড় শুরু করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত পরীক্ষার ১৫ দিনের মধ্যেই প্রিলির ফলাফল প্রকাশ করা হয়ে থাকে। সেই হিসাবে চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই প্রাথমিকের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা এস এম মাহবুব বলেন, ‘আমরা সাধারণত পরীক্ষার ফল ১৫ দিনের মধ্যে প্রকাশ করি। তবে যেহেতু বুয়েট বিষয়গুলো দেখে এবং তাদের ভর্তি পরীক্ষা চলছে; তাই কিছুটা সময় লাগতে পারে। তার পরও আমাদের লক্ষ্য ১৫ দিনের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা।’

সার্বিক বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি, এসবি এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে যেসব প্রশ্ন উদ্ধার করা হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে আমাদের প্রশ্নের কোনো মিল ছিল না। তবে প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা হয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষায় নকলের চেষ্টা হয়েছে। এটি প্রশ্নফাঁস নয়। এই নকলের দায়ে ২০৭ জনকে বহিষ্কার এবং অনেক জায়গায় মামলা হয়েছে, অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।’

পরীক্ষা বাতিলের দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, ‘চাকরিপ্রার্থীরা আমাদের কাছে পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। আমরা তাদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে বিষয়টি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে। এর আগেও দুটি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও গতকাল সন্ধ্যায় পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, লিখিত পরীক্ষা গ্রহণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় সারা দেশে প্রশ্নফাঁসসহ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কিছু কিছু কেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বনের অপচেষ্টাকারীদের শনাক্ত করে বহিষ্কারসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!