ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রানা শহীদ কল্লোলের গোল্ড সিন্ডিকেট

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

যশোর-বেনাপোল সীমান্তে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অপরাধ সাম্রাজ্য, যেখানে স্বর্ণ চোরাচালান, ভয়ভীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অবৈধ সম্পদের বিস্তার একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি ছিনতাই হওয়া একটি প্রাইভেটকার উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে এই চক্রের কার্যক্রম নতুন করে সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রমতে, আগে যশোর সীমান্তে স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালান সিন্ডেকেট নিয়ন্ত্রণে ছিল আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। ৫ আগস্টের পর এটি নিয়ন্ত্রণে নেয় বিএনপির শীর্ষ নেতার আশীর্বাদে যশোর জেলা বিএনপি ও যুবদলের নেতারা।

কেন্দ্রীয় যুবদলের এক শীর্ষ নেতার সাথে গোল্ড শহীদ যশোর জেলা যুবদল নেতা রানার মাধ্যমে ইতোমধ্যে গভীর সখ্য গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে। সূত্রমতে, এই পাচারচক্রের মূলহোতা হলেন, যশোর জেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনসারুল হক রানা, যশোরের শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শহীদ ওরফে গোল্ড শহীদ এবং আওয়ামী লীগ আমলের স্বর্ণ চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের হোতা বেনাপোলের গোল্ড নাসির। সম্প্রতি যশোর কোতোয়ালি থানায় উদ্ধার হওয়া একটি প্রাইভেটকারের ঘটনায় মাগুরা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোলের নাম স্বর্ণ চোরাচালান কারবারে সহায়তাকারী হিসেবে সামনে উঠে এসেছে।

তথ্যমতে, সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক অডিওতে শোনা যায়, ‘যুবদল নেতা কল্লোল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নাম উল্লেখ করে চোরাচালানে জড়িত এক ব্যক্তির স্ত্রীকে বলছেন, আপনার স্বামী নেই, তার রেখে যাওয়া যে গাড়ি রয়েছে সেটা আমরা নিয়ে নিব অথবা আপনার সন্তানকে অপহরণ করা হবে। এসবের পেছনে অমিত ভাই যুক্ত রয়েছে। তিনি আমাকে বিষয়টি (পাচারকৃত গোল্ড) মীমাংসার জন্য চাপ দিচ্ছেন।’ ওই অডিওটি মূলত গোল্ড পাচারের কথোপকথন। সরকারের বিশেষ গোয়েন্দার নজরে আসা অডিওটির তথ্য ও গোল্ড পাচার চক্রের তথ্য নিয়ে সম্প্রতি গোয়েন্দারা কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দারা জানান, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যুবদল নেতা রানা, কল্লোল ও ‘গোল্ড শহীদ’ সরাসরি জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রতিমন্ত্রীর বিষয়টি নিয়ে আরও গভীর তদন্ত করা হচ্ছে। যশোর সীমান্তে ছিনতাই, স্বর্ণ পাচার ও মাদকের অন্ধকার সাম্রাজ্য আগে আ.লীগের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বর্তমানে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে ধারণা গোয়েন্দাদের। তবে বেশকিছু জায়গায় প্রতিমন্ত্রী অমিতের নাম ভাঙিয়ে চলছে ক্ষমতার দাপট ও চোরাচালান। সরাসরি তিনি এসবে জড়িত না থাকলেও তার পলিটিক্যাল লোকজনের জড়িত থাকার ঘটনাও কম নয়।

এদিকে গত ৮ জানুয়ারি যশোর শহরের আরবপুর এলাকা থেকে ফাইমুর রহমান সান নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী ছিনতাইয়ের শিকার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩ থেকে ৪ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে অপহরণ করে চোখ বেঁধে খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় এবং তার ব্যবহৃত আইফোন ও প্রাইভেটকার ছিনিয়ে নেয়। পরে পুলিশি তৎপরতায় মাগুরা থেকে গাড়িটি উদ্ধার করা হয় এবং বর্তমানে তা কোতোয়ালি থানা হেফাজতে রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, এই ঘটনা সাধারণ ছিনতাই নয়; বরং স্বর্ণ পাচার-সংশ্লিষ্ট অর্থ বা সম্পদ নিয়ে বিরোধের ফল হতে পারে। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ সামনে এনেছেন গাড়িটির দাবিদার হিরা খাতুন। তিনি জানান, তার স্বামী আলী আহমেদ নিজেকে র‌্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচয় দিতেন। তার অভিযোগ, ‘গোল্ড শহীদ’ নামে পরিচিত ব্যক্তি ও তার সহযোগীদের ধারাবাহিক হুমকি ও মানসিক চাপের কারণে গত ৫ জানুয়ারি স্ট্রোক করে তার স্বামীর মৃত্যু হয়।

হিরা খাতুনের দাবি, স্বামীর মৃত্যুর পর বেনাপোল এলাকার শহীদ ওরফে গোল্ড শহীদসহ কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ফোন করে স্বর্ণের বার ফেরত দিতে বলেন। তারা হুমকি দিয়ে বলে, তার স্বামী তাদের বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ আত্মসাৎ করেছে এবং তা ফেরত না দিলে তাকে ও তার ছেলেকে হত্যা করা হবে। তিনি আরও জানান, প্রায় প্রতিদিনই তাকে ফোনে হুমকি দেওয়া হতো। তবে এসব স্বর্ণের বার বা তার স্বামীর সঙ্গে কী ধরনের বিরোধ ছিল সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। ক্রমাগত ভয়ভীতির কারণে একপর্যায়ে তিনি মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। প্রাইভেটকারটি নিজের হেফাজতে নিতে তিনি আদালতের আশ্রয় নেবেন বলেও জানিয়েছেন। তিনি এ ঘটনায় গোল্ড শহীদের পাশাপাশি আনসারুল হক রানা এবং মাগুরার ওয়াসিকুর রহমান কল্লোলের জড়িত থাকারও অভিযোগ তুলেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যশোর-বেনাপোল রুট এখন দেশের অন্যতম সক্রিয় স্বর্ণ পাচার করিডোরে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের দুর্বল পয়েন্ট ব্যবহার করে স্বর্ণ দেশে প্রবেশ করানো হয় এবং পরে ব্যক্তিগত গাড়ি, কুরিয়ার ও স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট।

সীমান্তভিত্তিক চোরাচালান কার্যক্রমে যশোর জেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনসারুল হক রানার বিরুদ্ধেও সিন্ডিকেটে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মাগুরা জেলা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় মধ্যস্থতা ও সমন্বয় করার অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, সংশ্লিষ্টদের অনেকেই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ, একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার এবং জমি ও নগদ বিনিয়োগে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক চাপ এড়াতে এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে ‘উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ’ দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগ বা মামলাও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ফলে এলাকায় এক ধরনের নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যশোর জেলা যুবদলের সাবেক প্রচার সম্পাদক ইস্কান্দার আলী জনি এক ফেসবুক লাইভে অভিযোগ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, যশোরে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই এবং একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনকে প্রভাবিত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি তার পোস্টে আরও দাবি করেন, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ভাইয়ের হুকুমে ১০০ মাদক মামলার আসামি গাড়ি ছিনতাইকারী স্বর্ণ চোরাচালানকারী গোল্ড শহীদকে দিয়ে শার্শার ওসিকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে আমার নামে অন্যায়ভাবে মিথ্যা গায়েবি ডায়েরি করিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক অপরাধ, যার পুরো চক্র শনাক্ত করতে সময় লাগবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ চোরাচালান শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। এর ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, কালো অর্থনীতির বিস্তার ঘটছে এবং অপরাধভিত্তিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। গোল্ড শহীদ, আনসারুল হক রানা ও কল্লোলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহারের দাবি এখন নিরপেক্ষ তদন্তের মুখোমুখি। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি দেশের অন্যতম বড় স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট উন্মোচনের পথ খুলে দিতে পারে।

জানতে চাইলে খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি এবং এসএমএস করলেও তিনি উত্তর দেননি। জানতে চাইলে যশোরের শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শহীদ জানান, এসবের সঙ্গে আমি জড়িত নই; হয়তো একটি চক্র জড়িত থাকতে পারে। তবে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্যি নয়।

এই বিষয়ে জানতে মাগুরা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোল রূপালী বাংলাদেশকে জানান, হিরা খাতুনকে চিনলেও গোল্ড শহীদ বা যশোর যুবদল নেতা রানাকে চিনি না এবং এই অপরাধের সঙ্গে আমি জড়িত নই।

জানতে চাইলে যশোর জেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনসারুল হক রানা রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গোল্ড ব্যবসার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। গোল্ড পাচারকারী আলী আহমেদের স্ত্রী হিরা খাতুন নামের কাউকে চেনেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথমে হিরা খাতুনকে চিনলেও পরে অস্বীকার করে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একজন আমার সঙ্গে ঢাকায় দেখা করেছেন, তিনি হিরা খাতুন কি না আমার জানা নেই।

জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গাড়ির বিষয়টি (গোল্ড পাচারে ব্যবহার করা প্রাইভেটকার) আমি জানি পরে শুনছি এসব কথা। যদিও এসব বিষয় নিয়ে দরকার হলে পুলিশ তদন্ত করবে তা ছাড়া কেউ জড়িত থাকলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসব বিষয়ে আপনাদেরও সহযোগিতা কাম্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী জানান, বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে যেই অপরাধে যুক্ত হবে বা থাকবে এবং অভিযোগ প্রমাণ হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।