ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জেন-জিরা কি ফের রাজপথে নামছে

এফ এ শাহেদ
প্রকাশিত: এপ্রিল ৭, ২০২৬, ০৪:১৭ এএম

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ থেকে রাজনীতির মাঠ। সরকারি দল বিএনপি সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেও বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১-দলীয় জোট, জুলাই রক্ষা মঞ্চ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি। এতে দেশ কি আবারও জেন-জি আন্দোলনের পথে হাঁটছেÑ এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির বক্তব্য, জুলাই সনদ নিয়ে কিছু ব্যক্তি বা দল বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ’২৪-এর বৃহৎ আন্দোলনের পর সাধারণ মানুষ স্বস্তির প্রত্যাশা করছে। ফলে চলমান পরিস্থিতিতে বৃহত্তর আন্দোলনের আশঙ্কা ক্ষীণ। তবে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হবে বলে মনে করছেন তারা।

সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা। তাদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে আলাদা কোনো সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে বিরোধী দল সনদ বাস্তবায়নে সংস্কার পরিষদের পক্ষে। তাদের মতে, জুলাই সনদ মানি, গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা মানি, গণভোট মানি এবং গণভোটের মাধ্যমে যে সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা, তাও মানি। এখানে না মানার কোনো স্থান নেই।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে কিছু ব্যক্তি বা দল বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমরা যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি, তা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করব। এটি আমাদের ১৬ বছরের লড়াইয়ের অঙ্গীকার।

তবে সরকারের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না বিরোধী দল। জুলাই সনদের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যেদিন গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করা হয়েছে, সেদিন থেকেই নতুন করে আবার ফ্যাসিবাদের যাত্রা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। আমরা এই যাত্রা থামিয়ে দেব ইনশা আল্লাহ। আমরা এগোতে দেব না।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ক্ষমতাসীনরা মেজরিটির বলে যদি সংস্কার থেকে পিছিয়ে যায়, তবে ’২৪-এর মতো আরেকটি অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি যেকোনো সময় শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি পরিবর্তনের জন্য নয়, রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের জন্যই ’২৪-এ গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। যদি আগের সিস্টেম অক্ষুণœ রাখা হয়, তবে যেকোনো ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে হাসিনা হয়ে উঠতে পারে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে গণতন্ত্রের কথা বলা হলে তা দেশে নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দেবে জানিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জুলাই চেতনা বিনষ্টের চেষ্টা করা হলে দেশে ‘আরেকটা জুলাই’ অবধারিত হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র সুসংহত করতে হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই সনদ বাদ দিয়ে যারা গণতন্ত্রের কথা বলে, তারা মূলত স্বৈরতন্ত্র কায়েমের পথে হাঁটছে। জনগণের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে যে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে উঠেছে, তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন না করলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হতে পারে।

সংস্কারের বিষয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সরকার প্রায়ই বলে, আগামী ১৫-২০ বছরেও দেশে কোনো গণঅভ্যুত্থান হবে না। কিন্তু ইতিহাসে এর নজির রয়েছে। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অর্জন যখন রক্ষা করা যায়নি, তখনই ’৭১ সংঘটিত হয়েছিল। একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অর্জন ও চেতনা যদি রক্ষা করা না যায়, তবে ২০২৬ বা ২০২৭ সালে আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তিনি বলেন, বিগত সময়ে আমরা ফ্যাসিবাদ দেখেছি আর এখন বর্তমান সরকারের মধ্যে স্বৈরাচারের সব লক্ষণ ফুটে উঠছে। যদি এই সরকার গণভোটের রায় মেনে না নেয়, তবে সেদিন থেকেই আমরা তাদের ‘অবৈধ সরকার’ হিসেবে ঘোষণা করব। আপনারা যেমন আমাদের অর্জনগুলো ধূলিসাৎ করতে সময় নিচ্ছেন না, আমরাও আপনাদের অবৈধ বলতে সময় নেব না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইসলামী দলের আমির ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের বলেন, বিএনপি সরকার যদি গণভোটের সমাধান না করে তাহলে এটা হবে জাতির সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি এই কর্মসূচিতে স্বাক্ষর করেছিল। এখন তারা নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়ে এটাকে অস্বীকার করছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের সমাধান করা না হলে এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

এ বিষয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতন ঘটাতে কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। এটি নির্ভর করে জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ওপর।  তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি গভীর ও কার্যকর রাষ্ট্র সংস্কার; কিন্তু বাস্তবতা শুধু একটি নির্বাচন।

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ নিজেই স্ব-ব্যাখ্যায়িত ও স্বচ্ছ একটি দলিল এবং এর বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংবিধানের সংশোধন। সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো পদ্ধতিতে এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে তিনি গণভোটের কিছু প্রক্রিয়াকে ‘ফ্রড অন দ্য কনস্টিটিউশন’ বা সংবিধানের ওপর প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেন।

প্রসঙ্গত, গণভোটের রায় মেনে সংস্কারের মাধ্যমে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে সম্প্রতি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট বিক্ষোভ করেছে। দিয়েছে বড় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, সংবিধান সংশোধনের মতো ‘রুটিন কাজের’ জন্য জুলাই বিপ্লব হয়নি, বরং সেই বিপ্লব ছিল রাষ্ট্রকাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের জন্য। গণভোটে জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন না করা মানে আগের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ মানুষ একটি বড় আন্দোলনের পর নতুন করে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত নয়, বা কোনো ধরনের পরিবেশও সৃষ্টি হয়নি। ফলে এখনই বড় কোনো আন্দোলনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে আন্দোলনের তীব্রতা যাই হোক, চলমান এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অস্থিরতা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।