প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন দেখা দেয়, এই সফরের মাধ্যমে সেটির অবসান ঘটিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করতে চায় ঢাকা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবীর। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের বর্তমান ‘থমকে যাওয়া’ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাভাবিক ও কার্যকর কূটনৈতিক পরিবেশে ফিরতে চায় বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে কেবল রাজনৈতিক অমীমাংসিত ইস্যু নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একগুচ্ছ বিষয় আলোচনার টেবিলে থাকবে। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑ ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনরায় চালু করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিক করা, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় ভারতের সমর্থন আদায়, শীর্ষ নেতাদের সফর বিনিময় এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকট নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিনিময়।
একইসঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতা মাথায় রাখে, সেই বার্তাও দিতে চায় বিএনপি সরকার। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে।
সম্পর্কের গতিপথ পাল্টাচ্ছে : অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত হওয়া প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনগুলোতে সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মুখে পড়েছিল ভারত সরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের দ-প্রাপ্ত অনেক নেতাকে ভারতের মাটিতে থাকতে দেওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। একপর্যায়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, নির্বাচনের পর তারা বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিবে।
এর মধ্যে নির্বাচনের আগে গত ডিসেম্বরে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মারা গেলে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়লাভ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। এসব ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
৪৮ ঘণ্টার সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে আজ বুধবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। সেখানে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, ভিসা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, ফারাক্কা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নসহ আরও বেশকিছু বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানতে পেরেছে।
ভারত সফর শেষে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একই ফ্লাইটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মরিশাস যাওয়ারও কথা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে ভারত ও বাংলাদেশের পরস্পরকে বোঝার সফর বলে বর্ণনা করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। এর মাধ্যমে আগামীতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সাক্ষাতের পথ প্রশস্ত হতে পারে বলেও ধারণা করছেন তারা।
দ-প্রাপ্ত পলাতক হাসিনা ও হাদি হত্যার আসামিদের ফেরত চাইবে বাংলাদেশ : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত দিতে ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ।
এই সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর পাশাপাশি পলাতক শেখ হাসিনা ও ওসমান হাদি হত্যার আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
দিল্লি সফরে অপরাধী প্রত্যর্পণ ইস্যু : দুই দিনের দিল্লি সফরের শুরুতেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সফরের দ্বিতীয় দিন আজ বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দ-প্রাপ্ত পলাতক শেখ হাসিনা এবং হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বিশেষভাবে উত্থাপন করা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতে অবস্থানরত অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। তিনি বলেন, ‘ভারতে থাকা অনেকেরই বাংলাদেশের আদালতে সাজা হয়েছে, আবার অনেকের বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান। এই বিষয়গুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার আশাবাদী’। ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি ভারত হাদি হত্যার আসামিদের প্রত্যর্পণ করবে। তবে, আইনি জটিলতা ও ইমিগ্রেশন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সেখানে তাদের বিচার চলায় এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।’
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর প্রসঙ্গ : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত রাজনৈতিক নেতাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেরই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, আবার কারো বিচার চলছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমান সফরে এই দাবিটি পুনরায় জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে।
ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া : পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরের ঠিক এক দিন আগে গত সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ূন কবীর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিষয়টি এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার (জুডিশিয়াল প্রসেস) মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে একটি মামলায় তার মৃত্যুদ- হয়েছে। ফলে আইনি প্রক্রিয়া নিজস্ব গতিতেই চলবে।’
উপদেষ্টা আরও যোগ করেন, ‘শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগী হিসেবে যারা সেখানে আছেন, তাদের বিষয়ে আমরা অবগত। তবে আজকের (গত সোমবার) বৈঠকে তার বিস্তারিত নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।’ দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমলের সেই অসম সম্পর্কের অধ্যায় এখন চিরতরে শেষ। আগের মতো সম্পর্ক আর হবে না; আমরা একটি নতুন ও সমমর্যাদার সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছি।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ২৩ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে ওঠা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয় ঢাকা। বর্তমানে তিনি ভারতেই অবস্থান করছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন