যশোর-বেনাপোল সীমান্তে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অপরাধ সাম্রাজ্য, যেখানে স্বর্ণ চোরাচালান, ভয়ভীতি প্রদর্শন, রাজনৈতিক এবং অবৈধ সম্পদের প্রভাব বিস্তার একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি ছিনতাই হওয়া একটি প্রাইভেট কার উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে এই চক্রের কার্যক্রম নতুন করে সামনে এসেছে। এসব ঘটনা অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছেন দুদক ও গোয়েন্দারা। তাদের উদ্দেশ্য, এই ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা আসল রহস্য ও ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা।
রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অভিযোগে প্রাথমিকভাবে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যেসব সদস্যের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই চক্রের বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুবদল একটি তদন্ত কমিটি কঠন করে এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে এবং বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণও পেয়েছে বলে জানা গেছে। তারা ৭ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধে যুক্ত থাকার প্রমাণ পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কেন্দ্রীয় যুবদল।
এই অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে এর আগেও দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে সংবাদ প্রকাশিত হয়। গোয়েন্দা তথ্য ও একটি অডিও কল রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই পাচারচক্রের মূল হোতা হিসেবে যাদের নাম আসছে তারা হলেনÑ যশোর জেলা যুবদলের সদস্যসচিব আনসারুল হক রানা, যশোরের শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শহীদ ওরফে গোল্ড শহীদ এবং আওয়ামী লীগ আমলের স্বর্ণ চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের হোতা বেনাপোলের গোল্ড নাসির। সম্প্রতি যশোর কোতোয়ালি থানায় চোরাচালানে সম্পৃক্ত অভিযোগে একটি প্রাইভেট কার উদ্ধারের ঘটনায় স্বর্ণ চোরাচালান কারবারে সহায়তাকারী হিসেবে মাগুরা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোলের নাম সামনে এসেছে।
গোয়েন্দা ও পুলিশসহ স্থানীয় একাধিক সূত্র মতে, যশোর-বেনাপোল সীমান্তে স্বর্ণ চোরাচালান, অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা এবং মাদক পাচারের মতো অপরাধের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখন স্থানীয় যুবদল নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ আছে। এই সিন্ডিকেটটিই আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মীরা।
গোয়েন্দা তথ্য মতে, ২০২৪-২৬ সময়কালে এই সিন্ডিকেট চক্র বেনাপোলের পুটখালী, দৌলতপুর, ঘিবা, গোগা এবং সাদিপুর সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ পাচার করে। এই পাচার চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত স্থানীয় বিএনপির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রূপালী বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। শুরু হয় অনুসন্ধান ও তদন্ত। আর এতেই বেরিয়ে আসছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে সম্প্রতি দুদকে একটি অভিযোগ দাখিল হয়। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে নামে দুদক, যশোর জেলা পুলিশ এবং বিজিবির একটি গোয়েন্দা দল। এরপর গত বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি) বিশেষ অভিযান চালিয়ে শার্শা উপজেলার রাজনগর গ্রামের রনি, চৌগাছা উপজেলার উত্তর কয়ারপাড়া গ্রামের আব্দুল গনি এবং কোতোয়ালি উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের ইসরাইলকে আটক করে। বিজিবি জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যশোর-নড়াইল মহাসড়কের নীলগঞ্জ ব্রিজ এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে (ঢাকা মেট্রো-গ ২২-৭৯৩০) তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় গাড়ির হেডরেস্টের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ৩ কেজির বেশি ওজনের ২৬টি স্বর্ণের বার, পাঁচটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৭ হাজার ৩২৭ টাকা উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় গাড়িও। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটকরা বিজিবিকে জানান, ঢাকার আব্দুল্লাহপুর ও উত্তরা এলাকার চোরাকারবারিদের কাছ থেকে তারা স্বর্ণের বার সংগ্রহ করে যশোরের চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, আটক তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।
এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, রানা, শহীদ ও কল্লোলের অপরাধ সাম্রাজ্য ও তাদের গোল্ড সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেটা তদন্ত করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক উপপরিচালক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, এসব অভিযোগের পরই সীমান্তে দুদকের গোয়েন্দা টিম কাজ করছে এবং সম্প্রতি এই চক্রের একজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, দলীয়ভাবে গঠন করা তদন্ত কমিটির এক সদস্য ও যুবদলের শীর্ষ এক নেতা জানান, দল কোনো অপকর্মের পক্ষে নেই। যুবদল সারা দেশে মানুষের মনে যে জায়গা করে নিয়েছে, সেটা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হোকÑ সেটা তারা চান না। যুবদল এ ধরনের অভিযুক্ত সবার বিরুদ্ধে আইনগত ও সাংঠনিক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
এদিকে এসব অপকর্ম ঢাকতে এবং অপকর্ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় আনসারুল হক রানা এই প্রতিবেদককে মামলা ও খুনের হুমকি দেন। যুবদল নেতা রানা একটি লিগ্যাল নোটিশে জানান, দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, সেটা ষড়যন্ত্র। আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অন্যথায় মামলার হুমকি দেন তিনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির তদন্ত টিমের প্রধান শাহ নাসির উদ্দিন রুমান রূপালী বাংলাদেশকে জানান, আমার এসব অভিযোগের প্রমাণ পেলে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানিয়ে থাকি। কেন্দ্রীয় কমিটি এসব বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গুরুতর অভিযোগ পেলে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।


