× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

পারভেজ খান

প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২৬, ০৫:২১ এএম

দুর্বিষহ নগরজীবন

পারভেজ খান

প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২৬, ০৫:২১ এএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন চালকরা এক ‘আজব’ অভিযোগ করছেন। গ্যাসের বদলে লাইনে ঢুকছে ‘হাওয়া’। প্রয়োজনের এক-চতুর্থাংশ গ্যাসও মিলছে না। সিএনজি পাম্পে নজেল লাগানোর পর মিটারে গ্যাস দেখালেও চাপ নেই। গাড়ির সিলিন্ডার ভরছে ধীরে বা ঠিকমতো ভরছে না। আর এই সেবা পেতে  লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একই চিত্র ঘরে ঘরেও। রান্নাঘরে এখন আগুনের চেয়ে বেশি জ্বলছে মানুষের ক্ষোভ। গৃহিণীদেরও অদ্ভুত অভিযোগ, বাসাবাড়ির চুলা জ্বালাতে গেলে শোঁ-শোঁ শব্দ হয়; কিন্তু  আগুনের দেখা মেলে না। কোনোমতে আগুন ধরলেও তা যেন মোমবাতির শিখা। জ্বালানি খাতের এই অচলাবস্থা এখন নগরজীবনের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, গ্যাস নিয়ে সমস্যাটা কোথায়? শেষ কোথায় এই ভোগান্তির? উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়া, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও চাহিদা বৃদ্ধিই এর মূল কারণ। পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক হলে এবং কয়েকটি রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ হলে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে পরিস্থিতি এই মুহূর্তে বা দ্রুত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। এদিকে সরকারি সূত্র বলছে, এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক হলে ও কয়েকটি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়লে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে।

যে যা-ই বলুন না কেন, বাস্তবতা হলো, তীব্র গ্যাস সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়ছে রাজধানীবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাসাবাড়ির চুলাতে গ্যাস না থাকা বা অত্যন্ত স্বল্পচাপের অভিযোগ উঠছে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়। অনেক এলাকায় দিনের বেলা গ্যাসের হদিস মেলে না। গ্যাস আসে গভীর রাতে।

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, শান্তিনগর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং খবর নিয়ে জানা গেছে, সব জায়গার চিত্র একই। মিরপুরের এক গৃহিণী বলেন, সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চুলা জ্বলে না। চুলা দিয়ে শুধু হাওয়া আসে, গ্যাস আসে না।

শান্তিনগরের গৃহবধূ ইভানা জামান বলেন, গ্যাসের আগুন জ্বলে না, আগুন জ্বলে এখন মাথায়। আগে গ্যাস কম ছিল, এখন তো নেই-ই। রান্না করতে গেলে মনে হয় যুদ্ধ করছি। ভোরে উঠে নাস্তা বানানোর কথা, সন্তানের টিফিন প্রস্তুত করার তাড়া, সবই থেমে যায় চুলার সামনে এসে। চুলা জ্বালাতে গেলে ‘হাওয়া’ বের হয়; কিন্তু আগুন জ্বলে না।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গৃহবধূ সালমা আক্তার বলেন, এই যুদ্ধটা শুধু আগুন জ্বালানোর নয় এই যুদ্ধ সময়ের সঙ্গে, জীবিকার সঙ্গে, সংসারের সঙ্গে। যারা চাকরিজীবী, তাদের সকাল এখন আতঙ্কে শুরু হয়। কখন গ্যাস আসবে, আদৌ আসবে কি না এই অনিশ্চয়তায় দিন কাটে। অনেকে বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা বা সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু সবার পক্ষে কি তা সম্ভব?

গ্যাস সংকট এখন কেবল রান্নাঘরে আটকে নেই, ছড়িয়েছে রাজপথে, শিল্পকারখানায়ও। গ্যাস নেই সিএনজি স্টেশনগুলোতে। দিন দিন এটি জনজীবনের জন্য বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে। অফিসগামী মানুষ সময়মতো বের হতে পারছেন না। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন আর পরিবহনে মিলছে না সিএনজি গ্যাস।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলে বা সরবরাহ ব্যাহত হলে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তারা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, চাহিদা-জোগানের অসামঞ্জস্য এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব এখন প্রকট আকারে সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানিনির্ভর এলএনজির সরবরাহে ওঠানামা, ডলার সংকট, পুরোনো পাইপলাইন ও অব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সংকট যদি পূর্বানুমানযোগ্যই ছিল, তাহলে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি কেন?

পেট্রোবাংলার সূত্র অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ থেকে ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। কিন্তু সরবরাহ নেমেছে ৩০০০-৩২০০ এমএমসিএফডির ঘরে। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি ৭০০-১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত। পক্ষান্তরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন কমে গেলেও বিকল্প উৎস প্রস্তুত করা হয়নি সময়মতো। এর ওপর যুক্ত হয়েছে এলএনজি আমদানির অনিশ্চয়তা। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সরবরাহকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। সব মিলিয়ে অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। স্টেশনকর্মী ও চালকরা বলছেন, কম চাপের কারণে গ্যাস দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিরাজমান এই পরিস্থিতির কারণে গণপরিবহনেও সংকট তৈরি হচ্ছে।

পরিবহন মালিক সমিতির নেতা সাইফুল আলম গতকাল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গ্যাস না থাকলে গাড়ি চলবে কীভাবে? ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থাকলে দিনে ট্রিপ কমে যায়, আয় কমে যায়। এতে ভাড়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যমূল্যও বৃদ্ধি পেতে পারে। আর গ্যাসের সঙ্গে যে পরিমাণ হাওয়া ঢুকছে তাতে এটা ভেবে দেখা দরকার যে, এটি শুধু ভোগান্তি নয়, সিস্টেম সুরক্ষার দিক থেকেও উদ্বেগজনক। গ্যাস-বাতাসের মিশ্রণ অনিয়ন্ত্রিত হলে তা নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বসুবন্ধরা আবাসিক এলাকার গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাত ৯টায় অফিসের কাজ শেষ করে গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়ান। গ্যাস পেতে পেতে রাত ৩টা বেজে যায়। এরপরও প্রয়োজনের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ গ্যাস পান। সেটাও আবার অর্ধেক হাওয়া। পরদিন সকাল ৮টা থেকে আবার ডিউটি। অধিকাংশক্ষেত্রে দিনের অর্ধেক সময় পার হতেই গ্যাস শেষ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীর চুলায় আগুন না জ্বলা কিংবা সিএনজি পাম্পে ‘হাওয়া’ ঢোকার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি জ্বালানি খাতের গভীর অসামঞ্জস্যের বহিঃপ্রকাশ। সাময়িকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে চাপ সামাল দেওয়া গেলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ সংকট থাকবেই। এ সমস্যা নিরসনে শিল্প খাতে রেশনিং, সিএনজি সরবরাহে সময়ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং আবাসিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস দেওয়ার নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান, দ্রুত নতুন কূপ খনন, বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং এলপিজির ব্যবহার সম্প্রসারণেরও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

‘হাওয়া’ ঢোকার প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যখন সিস্টেমে পর্যাপ্ত গ্যাস প্রেসার থাকে না, তখন লাইন নেগেটিভ প্রেসারে যেতে পারে। এতে লিক পয়েন্ট বা দুর্বল জয়েন্ট দিয়ে বাতাস ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তখন গ্রাহকপ্রান্তে গ্যাসের বদলে ‘হাওয়া’ অনুভূত হতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন চাপ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাপ হঠাৎ কমে গেলে বা কোনো অংশে ভ্যাকুয়ামসদৃশ অবস্থা তৈরি হলে লাইনে বাইরের বাতাস ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

তিনি আরও বলেন, সিএনজি স্টেশনগুলোতে সাধারণত ফিল্টার ও সেফটি সিস্টেম থাকে। তবে সরবরাহ দীর্ঘসময় চাপহীন থাকলে বা বারবার ওঠানামা করলে যন্ত্রপাতির ক্ষতি, অপারেশনাল ঝুঁকি এবং আর্থিক লোকসান বাড়ে।

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম বলেন, সমস্যার মূলে রয়েছে নীতিগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অসামঞ্জস্য। স্বল্পমেয়াদে রেশনিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ ছাড়া উপায় নেই।

বুয়েটের আরেক সাবেক অধ্যাপক আজিম চৌধুরী গতকাল টেলিফোনে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গত এক দশক ধরে আমরা দেশীয় অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি আনতে পারিনি। গভীর সমুদ্রে কার্যকর উদ্যোগ নেই, স্থলভাগেও অনুসন্ধান সীমিত। ফলে উৎপাদন কমবে, এটা জানা ছিল। কিন্তু বিকল্প প্রস্তুতি ছিল না। তিনি আরও বলেন, এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। আমদানিনির্ভর জ্বালানি কখনোই স্থিতিশীল সমাধান হতে পারে না, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকলে।

আজিম চৌধুরী বলেন, গ্যাসের চাহিদা বাড়বে, এটা স্বাভাবিক। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র সব জায়গায় গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি সমান তালে। ফলে এখন চাপ পড়ছে আবাসিক ও সিএনজি খাতে।

জ্বালানি বিশ্লেষক শামসুল আলম বলেন, রাজধানীর তিতাস গ্যাসের বিতরণ লাইনে বহু জায়গায় চাপ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পুরোনো পাইপলাইন, অবৈধ সংযোগ এবং সিস্টেম লসের কারণেও কার্যকর সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না। পাশাপাশি গ্যাস লাইনের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে লিক। এর কারণেও অনেক গ্যাস অপচয় হচ্ছে। তাই গ্যাস শুধু উৎপাদন করলেই হবে না, সঠিকভাবে বিতরণ, পরিবেশন ও সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। লাইন সংস্কার, স্মার্ট মিটারিং ও অবৈধ সংযোগ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সংকট থেকেই যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার দায় একক কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, সময়মতো অনুসন্ধান না করা, আমদানি সক্ষমতা সীমিত রাখা এবং বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতির সম্মিলিত ফল এখন নগরবাসী ভোগ করছেন।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!