রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সি নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় আসা তার সন্তান যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করেছে সরকার। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তাকে বদলির মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উনি-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, জনস্বার্থে জারীকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ড. এ কে এম আনিসুর রহমান আগামী ৪ জুনের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করবেন। নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করলে তাকে একই দিন অপরাহ্ণে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজড) হিসেবে গণ্য করা হবে।
এর আগে নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ছেলে হিসেবে আলোচিত যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি বলেন, অবশ্যই বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। আইন অনুযায়ী যা করণীয়, সেটাই করা হবে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান।
তিনি বলেন, বাবা-মায়ের ভরণপোষণ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোনো ধরনের অবহেলা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন। এদিকে আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গত রাত থেকে তিনি ফোন ধরেননি।
নিঃসঙ্গভাবে মৃত্যুবরণ করা নূরজাহান বেগম তার মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, নূরজাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাট অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। ফুটেজে দেখা যায়, নূরজাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো আবরণ পড়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখা গেছে।
নূরজাহান বেগমের মরদেহ পুলিশ উদ্ধারের পর আবার আলোচনায় এসেছেÑ ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি। আইন প্রণয়নের ১০ বছর পর ২০২৩ সালে এর বিধিমালা করা হয়। আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা ও মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন। আইন না মানলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবেন বা অর্থদ- অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদ-ে দ-িত হবেন।
এদিকে পুলিশের ঝামেলা এড়াতে প্রথমে মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন সরকারের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান। পরে তিনি তার মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। গতকাল মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমোডর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার সাংবাদিকদের বলেন, আনিসুর রহমান প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, নূরজাহান বেগম তার মা এবং তিনি মারা গেছেন। আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে কমোডর শফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সচিবালয় থেকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তাকে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়া যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা একাকী জীবনযাপন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, একই বাসায় কাছাকাছি অবস্থানে থাকলেও তার মেয়ে মৃত্যুর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাননি। স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, নূরজাহান বেগমের দুই ছেলে দীর্ঘদিন আলাদা থাকতেন এবং তাদের সঙ্গে মায়ের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না। নূরজাহানের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সন্তানদের দায়িত্ব ও অবহেলার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে রিট : নূরজাহান বেগমের গলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করা হয়েছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ‘কেয়ারগিভার’ নিয়োগের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে সেই আবেদনে। গতকাল আইনজীবী মো. শরীফ সরকারের পক্ষে জনস্বার্থে এ রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।
সেখানে বলা হয়, প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও সন্তানেরা মায়ের চিকিৎসা ও যতেœ চরম অবহেলা করেছেন, যা আইনে অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটানোর শামিল। ওই বৃদ্ধাকে পর্যাপ্ত খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এমনকি তাকে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে আটকে রাখা হয়ে থাকতে পারে, যা বাংলাদেশের সংবিধান ও মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের সরাসরি লঙ্ঘন। এ ছাড়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশকে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সাত দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আরজি জানানো হয়েছে ওই আবেদনে।
রিট আবেদনে স্বরাষ্ট্র, আইন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব, পুলিশের আইজিপি, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং পল্লবী থানার ওসিকে বিবাদী করা হয়েছে। রিটকারীর আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী বলেন, আগামী সোমবার বিচারপতি ফাতেমা নজিবের কোর্টে এ আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।
বাবা-মায়ের ভরণপোষণ না করলে জরিমানা : ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩’ অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তান তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। আইনটিতে ভরণপোষণের দায়িত্ব, এর পরিধি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে শাস্তির বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, জন্মদাতা পিতা ও গর্ভধারিণী মা ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পিতা-মাতার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে।
ভরণপোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতাকে, কিংবা উভয়কে, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও একসঙ্গে কিংবা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। এ ছাড়া প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার স্বাস্থ্যের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। পিতা বা মাতা সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করলে তাদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করাও সন্তানের দায়িত্ব। কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়, সন্তানদের থেকে পৃথকভাবে বসবাস করলে প্রত্যেক সন্তানকে তার দৈনন্দিন আয়-রোজগার অথবা মাসিক বা বার্ষিক আয়ের যুক্তিসংগত অংশ নিয়মিত পিতা-মাতাকে দিতে হবে।
দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণ : আইন অনুযায়ী, পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদি এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানির ভরণপোষণের দায়িত্বও সন্তানের ওপর বর্তায়। এ ভরণপোষণ পিতা-মাতার ভরণপোষণের অংশ হিসেবে গণ্য হবে।
পিতা-মাতা কিংবা তাদের অবর্তমানে দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণপোষণ না করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদ- হতে পারে। অর্থদ- অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদ-ের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া কোনো সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় ভরণপোষণে বাধা দিলে বা এ বিষয়ে অসহযোগিতা করলে, তারাও একই দ-ে দ-িত হবেন।
গত রোববার রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকা থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন পেয়ে একটি ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগমের পচা-গলা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয় সূত্র ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন তিনি একাই সেখানে বসবাস করতেন এবং মৃত্যুর বিষয়টি সময়মতো কাউকে জানানো হয়নি। তবে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানান, ওই বাসায় বৃদ্ধা তার মেয়ের সঙ্গে থাকতেন এবং বাসার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। নূরজাহান বেগমের এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরিবারের সদস্যদের অবস্থান ও যোগাযোগহীনতা নিয়েও তদন্ত চলছে।

