× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৫:৩৮ এএম

তাপস-খোকনের আশীর্বাদে পেয়েছেন একের পর এক প্রকল্প

ডিপ্লোমা পাস করেই প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৫:৩৮ এএম

ডিপ্লোমা পাস করেই প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ

ডিপ্লোমা সনদ দিয়েই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্থপতির চাকরি পান সিরাজুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ২৮ বছরের চাকরিজীবনে হয়ে যান প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ। সেই সঙ্গে আঙুল ফুলে হয়েছেন কলাগাছও। বিশেষ করে সাবেক দুই মেয়র ফজলে নূর তাপস ও সাঈদ খোকনের ছত্রছায়ায় হাতিয়েছেন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এক সিগন্যাল বাতি প্রকল্প থেকেই হাতিয়ে নেন ৩৮ কোটি টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যান সেখান থেকেও। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। অবশেষে অতিরিক্ত দায়িত্বসহ ডিএসসিসির সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সনদের সত্যতা যাচাইয়ে গঠন করা হয়েছে বিশেষ কমিটিও। যদিও সিরাজুল দাবি করছেন তার বিরুদ্ধে একটা চক্র ষড়যন্ত্র করছে। তবে সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে রূপালী বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম।

সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলোÑ স্থাপত্যবিদ না হয়েও তিনি গত ২১ বছর যাবৎ প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এমনকি স্থাপত্যবিদ্যার সনদ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। এই সনদ যাচাইয়ে গত ১ জুন ডিএসসিসির সচিব, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং আইন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এক দপ্তর আদেশে বলা হয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্থপতি পদে নিয়োগপ্রাপ্ত সিরাজুল ইসলামের নিয়োগকালীন শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য অভিজ্ঞতা সংবলিত কাগজপত্র যাচাই করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। একই দিন অপর এক দপ্তর আদেশে সিরাজুল ইসলামের নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্বও বাতিল করা হয়। অব্যাহতি দেওয়া হয় তাকে চাকরি থেকে।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগের টানা ক্ষমতায় থাকাকালীন সিরাজুল ইসলাম তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন ও ফজলে নূর তাপসের সহায়তায় অন্তত ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। আর এসব প্রকল্প থেকে নিজের আখের গুছিয়ে হয়েছেন শত শত কোটি টাকার মালিক। এসব প্রকল্পে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি তৎকালীন নগর প্রশাসন। তৎকালীন সরকারদলীয় দুই মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাঈদ খোকনকে ম্যানেজ করে বারবার পার পেয়ে গেছেন তিনি। এমনকি নকল সনদে ছাত্রলীগের এক নেতাকে প্রকল্পের প্রকৌশলী নিয়োগ দিলেও সে ব্যাপারে নীরব ছিলেন তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়ররা। শুধু তাই নয়, ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যালের নাম করে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প থেকে ৩৮ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভুল পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকারি টাকা ও সময়ের অপচয় করেছেন উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৎকালীন জনসংযোগ শাখার এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘তার দাপটে নগর ভবনে কোনো কাজই ঠিকভাবে করা যেত না। কখনো কখনো মেয়রের চাইতেও সিরাজুল ইসলামের দাপট ছিল বেশি। কত অনিয়ম যে চোখের সামনে হতে দেখেছি। সব দেখেও চুপ থাকতে হয়েছে।’

সিরাজুলের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউক্রেনের খারকভ ইনস্টিটিউট থেকে স্থাপত্য বিষয়ে ডিপ্লোমা পাস করেন সিরাজুল ইসলাম। কিন্তু তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) বিজ্ঞপ্তি ও তপশিলে উল্লিখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও বিশেষ সিগন্যালে তিনি স্থপতির চাকরি পান। তারপর স্থপতি পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা চায় ডিসিসি। সিরাজুল ইসলাম ডিপ্লোমা অর্জনের ৩ বছর ৫ মাস ২১ দিন পর স্থপতি পদে যোগ দেন। কিন্তু প্রজ্ঞাপন ও তপশিলের ধার না ধেরে ২০০৪ সালে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) এক অফিস আদেশে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয় সিরাজুল ইসলামকে। ২০১১ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আলাদা হলে ওই অফিস আদেশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তারপর নতুন কোনো আদেশ ছাড়াই গত ২১ বছর ধরে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে কর্মরত ছিলেন এই সিরাজুল।

আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হওয়ায় বড় বড় প্রকল্পে সিরাজুল ইসলামকে দায়িত্ব দিয়েছেন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও ব্যারিষ্টার ফজলে নূর তাপস। প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্প (২০১৫-২০২৩), প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট-ডিসিএনইউপি (২০০৯-২০১৪), ৮০০ কোটি টাকার নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প- কেইস (২০০৯-২০১৪) এবং প্রায় ৮ কোটি টাকার ইন্টিগ্রেটেড মাস্টারপ্ল্যান ফর ঢাকা (২০২০-২০২৩) প্রকল্পের পরিচালক করা হয় তাকে। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তিনি একই সময়ে তিনটি বড় প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি প্রকল্পে স্বজনপ্রীতির নামে আত্মসাৎ করেছেন বড় অঙ্কের টাকা। শুধু তাই নয়, নগর পরিকল্পনা বিভাগকে জালিয়াতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া বানিয়ে ফেলেছিলেন দাবি করে বর্তমানে ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডিএসসিসির মতো শীর্ষ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে নগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় তার কোনো অংশগ্রহণ নেই। পরিকল্পনাবিদের চেয়ারে বসে প্রকল্পের সরকারি টাকা লোপাট করেছেন এতদিন, যার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে আমাদের কাছে। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে আসা অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে যে, ডিএসসিসির অনুন্নত এলাকার উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্টে (ডিসিএনইউপি) পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়ে ভুয়া সনদ দিয়ে পল্টন থানা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তবে বিষয়টি সেই সময় জানাজানি হলে তৎকালীন প্রশাসন ওই প্রকৌশলীকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু সিরাজের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর বাইরেও তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগের প্রমাণ আমরা পেয়েছি। যা তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে বিস্তারিত জানানো যাবে।’

তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক সিগন্যালের ৩৮ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, সেটির কোনো প্রমাণ পেয়েছেন কি নাÑ জানতে চাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, তৎকালীন সময়েই বিশ^ব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট এই প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। প্রকল্পটির ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ অংশের শেষ দিকের পরিচালক ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি প্রকল্প পরিচালক থাকার সময়েই ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যালসহ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ শেষ হয়। কিন্তু কেইস প্রকল্পের পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তৈরির নামে ৩৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন সিরাজুল ইসলাম। অথচ কোথাও কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়নি, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ এখন আনসারদের বেডরুম। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি করেই এত দিন দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

সর্বশেষ গত ২০২১ সালের ২৪ জুন দক্ষিণ সিটি এলাকার সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে ডিএসসিসি। শুরুতে মেয়াদকাল এক বছর হলেও পরে সময় বাড়ায় সংস্থাটি। মেয়াদকাল শেষে কারিগরি কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। কারিগরি কমিটি ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাদের শাস্তির সুপারিশ করে। প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনার কাজে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে স্থাপত্যের কাজের জন্য নেওয়া হয় সিরাজুলের নেতৃত্বে। ফলে সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। সে পরিকল্পনায় মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকাকে অচল হিসেবে দেখানো হয়।

তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে সিরাজুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি, বরং তিনি নিজেই চাকরির ২৮ বছর যাবৎ পদোন্নতি না পেয়ে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতির জন্য আবেদন জানিয়েছেন। এমনকি সারা জীবন সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন দাবি করে রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘২৮ বছরের চাকরিজীবনে ২১ বছর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু কোনো ধরনের পদোন্নতি হয়নি। তাই আমি নিজেই চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়েছি এবং সরকার তা মেনে নিয়ে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছে।’ আপনার বিরুদ্ধে জাল সনদ দিয়ে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছেÑ এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যদি তদন্ত হয়, তাহলেই এর সত্যতা প্রকাশ পাবে। আপনি দয়া করে আমাকে এ বিষয়ে আর ফোন করবেন না।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!