বিশ্বকাপের রাত মানে সাধারণত একটিই ছবিÑ ঝলমলে আলো, পতাকা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর কোটি চোখে উত্তেজনা। কিন্তু এই আলোরও একটি অদৃশ্য ছায়া থাকে। সেই ছায়ার ভেতরেই আসল বিশ্বকাপটা বেঁচে থাকেÑ যেটা টেলিভিশনে দেখা যায় না, স্কোরবোর্ডে ওঠে না, এমনকি ইতিহাসের পাতাতেও খুব ছোট করে চাপা পড়ে যায়। আজ রাতেও যখন উদ্বোধনী সুর বেজে উঠবে, স্টেডিয়ামের গ্যালারি যখন একসঙ্গে দুলবে, তখন মাঠের নিচে, করিডরে, ভেজা ঘাসের গন্ধে আর যন্ত্রের শব্দে মিশে থাকবে কিছু মানুষের নিঃশব্দ জীবন। তাদের কেউ জার্সি পরেন না। কেউ ট্রফির জন্য হাত বাড়ান না। তবু এই বিশ্বকাপ তাদেরই হাতে দাঁড়িয়ে থাকে এক অদৃশ্য ভারসাম্যে।
স্টেডিয়ামের ভেতর ঘাসের নিচে যে পৃথিবীটা থাকে, সেটা আলাদা এক শহর। সেখানে প্রতিদিন ভোরে একদল মানুষ নামেন, যেন কোনো ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে। তারা ঘাস ছুঁয়ে দেখেন, মাটি শোনেন, বাতাস বোঝেন। একজন কিউরেটর বলেছিলেন, ‘ঘাসও কথা বলে, শুধু শোনার অভ্যাস থাকতে হয়।’
এই ঘাসই কখনো ম্যাচ বদলে দেয়। কখনো বলের গতি এক সেকেন্ড দেরি করে, কখনো কোনো স্ট্রাইকারের পা পিছলে দেয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে যে গোলটা ‘অবিশ্বাস্য’ বলে লেখা হয়, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে এই ঘাসের নীরব সিদ্ধান্ত।
আর বাইরে, গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তার মানুষটা। তার চোখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কিন্তু তিনি দেখছেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নাটক শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি জানেন, মানুষের ভিড়ের মধ্যে কত রকমের গল্প ঢুকে পড়ে। একজন বাবা, যিনি ছেলের হাতে জার্সি গুঁজে দিয়েছেন; একজন তরুণ, যে প্রথমবার শহরের বাইরে এসেছে; একজন বৃদ্ধ, যিনি হয়তো শেষবারের মতো এত ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেনÑ তিনি তাদের আটকান না। শুধু চোখ নামিয়ে স্ক্যান করে দেন প্রবেশপথে। তার কাজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; কিন্তু আসলে তিনি মানুষের আবেগকে স্টেডিয়ামের ভেতর ঢুকতে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা এক নীরব পাহারাদার।
আর স্টেডিয়ামের ভেতর, আলো-ঝলমলে পর্দার পেছনে বসে থাকে ঠঅজ রুম। সেখানে সময় থেমে থাকে। ঘড়ির কাঁটা চলে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষের চোখে সময় জমে যায়। একজন টেকনিশিয়ান বারবার একই ফ্রেম দেখেন। একটা ফাউল, একটা অফসাইড, একটা স্পর্শÑ এই সামান্য মুহূর্তগুলোর ওপর ঝুলে থাকে কোটি মানুষের আনন্দ বা কান্না। তিনি জানেন, তার একটি ক্লিক ইতিহাস বদলে দিতে পারে; কিন্তু তার নাম কখনো ইতিহাসে লেখা হবে না। বিশ্বকাপের সবচেয়ে অদ্ভুত ট্র্যাজেডি এখানেই। সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় সবচেয়ে নীরব মানুষদের হাতে।
আর বলটা? যে বল আজ রাতের প্রথম কিক-অফে আকাশে উঠবে, সেটা শুধু চামড়া আর বাতাসের তৈরি নয়। সেটা তৈরি হয়েছে কারো ঘামের ভেতর দিয়ে। কোনো এক ছোট শহরের কারখানায়, যেখানে দিনের পর দিন একজন শ্রমিক একই সেলাই টানেন, একই গিঁট বাঁধেন, একই নিখুঁত বৃত্ত বানান। তিনি হয়তো জানেন না, কোন ম্যাচে তার বানানো বল গোল হয়ে ঢুকবে জালে, আর কোন বল ফিরে যাবে পোস্টে লেগে। তবু প্রতিটি বল বানানোর সময় হয়তো তিনি খুব আস্তে করে বলেন, ‘ভালো খেলিস!’
এই পৃথিবীতে বিশ্বকাপের ট্রফি একটাই, কিন্তু তার ভেতরে থাকে হাজার হাজার মানুষের অদৃশ্য হাতের ছাপ। যখন ক্যামেরা রাতের আকাশে আতশবাজি ধরবে, তখন সবচেয়ে বড় দৃশ্যটা আসলে দেখা যাবে না। দেখা যাবে না সেই কিউরেটরকে, যিনি শেষবার ঘাসে পানি দিচ্ছেন ক্লান্ত চোখে। দেখা যাবে না সেই নিরাপত্তাকর্মীকে, যিনি ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একাকী মানুষটার দিকে একটু বেশি সময় তাকিয়ে আছেন। দেখা যাবে না ঠঅজ রুমের সেই নিঃশব্দ মানুষটিকে, যিনি ঠিক জানেন তার একটি সিদ্ধান্তে কারো স্বপ্ন ভাঙছে। দেখা যাবে না সেই শ্রমিককে, যিনি টিভির সামনে বসে নিজের সেলাই করা বলটা চিনতে চেষ্টা করছেন। তবু বিশ্বকাপ তাদের ছাড়া হয় না। তারাই একেকজন অদৃশ্য খেলোয়াড়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন