যেসব আসনে বিএনপির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছে সেখানে সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের (এমপি) দায়িত্ব দিয়েছে দলটি। এসব জায়গায় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙা রাখতে এই কৌশল নিয়েছে দলটি। দলীয় সূত্র জানায়, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যরা কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবেন। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, উন্নয়নকাজের খোঁজখবর রাখা এবং সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো দৃশ্যমান রাখতে সহায়তা করবেন তারা। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে প্রতিযোগিতা এড়াতে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য আছেন এমন আসনগুলোয় তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফাহিমা নাসরিন মুন্নির রাজনৈতিক এলাকা মুন্সীগঞ্জ-৩ হলেও তাকে ঝিনাইদহ-৩ ও ঝিনাইদহ-৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দুটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।
ফাহিমা নাসরিন বলেন, ‘আমাদের মূলত সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এবার যেসব আসনে অন্য দলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, সেসব এলাকার স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। যাতে আগামী দিনে আমরা আরও ভালোভাবে মাঠে ফিরতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর মাধ্যমে আমরা স্থানীয় নেতাদের দিয়ে ওইসব এলাকায় আরও জোরালো জনসম্পর্ক গড়তে চাই’। তবে এই দায়িত্বকে অন্য দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর খবরদারি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলেও জানান তিনি।
সংরক্ষিত আসনের আরেক নারী সংসদ সদস্য সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা দায়িত্ব বণ্টনের এই প্রক্রিয়াকে ‘স্মার্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক, দুই লক্ষ্যই পূরণ হবে। যেসব আসনে বিএনপি জিততে পারেনি, সেখানেও দলের নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর ধরে কাজ করেছেন। তাদের রাজনৈতিক সমর্থন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছানো এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানে সাহায্যের প্রয়োজন’।
সানসিলা জেবরিন বলেন, ‘যে আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য জয়ী হয়েছেন, বিএনপি সেখানে এলাকার উন্নয়ন এবং নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে। ওই এলাকায় বিএনপির এমন অনেক নেতাকর্মী আছেন, যারা বছরের পর বছর ধরে দলের জন্য কাজ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হয়তো অন্য দলের কোনো সংসদ সদস্যের কাছে সাহায্য চাইতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না’। সানসিলার ভাষায়, ‘উদাহরণ হিসেবে, ছাত্রদলের কোনো কর্মীর যদি চাকরি বা কাজের জন্য কোনো আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) প্রয়োজন হয়। তবে তিনি একজন বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যের কাছেই সেই সাহায্য চাইবেন, জামায়াতের এমপির কাছে নয়’।
ঢাকা-১২, ঢাকা-১৫ ও ঢাকা-১৬ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ফেরদৌসী আহমেদকে। এসব আসনে জামায়াতের প্রভাবশালী নেতারা এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা-১৫ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। এ ছাড়া বীথিকা বিনতে হোসাইনকে সাতক্ষীরা-১, ২, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানের কটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।
আরিফা সুলতানা রুমাকে পাবনা-১, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুর-১ আসনে জেসমিন জুঁই এবং বরগুনা-১ আসনে সেলিনা রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে সানজিদা ইসলাম তুলি, যশোরের চারটি আসনে সুলতানা আহমেদ এবং কুমিল্লার একটি আসনে দায়িত্ব পেয়েছেন রাশেদা বেগম হীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘এই পদক্ষেপ দলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। নারী সংসদ সদস্যরা এসব এলাকায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন এবং হাতছাড়া হওয়া আসনগুলোয় দলের জনসম্পর্ক নতুন করে গড়তে তারা সাহায্য করতে পারেন কি না, দল তা মূল্যায়ন করবে’। ভবিষ্যতে সরাসরি নির্বাচনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও তাদের এই কাজের মূল্যায়ন বিবেচনা করা হতে পারে বলে ওই নেতা জানান।
ফাহিমা নাসরিন বলেন, ‘নতুন এই দায়িত্বের ফলে নারী সংসদ সদস্যরা নিজেদের চেনা রাজনৈতিক এলাকার বাইরে কাজ করার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে তারা বড় পরিসরে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পাবেন’।
তিনি বলেন, ‘কী কারণে আমরা আগে হেরেছি এবং এখনকার পরিস্থিতি কী এসব মূল্যায়ন করেই আমাদের কাজ করতে হবে’।
তবে বিএনপি নেতারা স্বীকার করছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা খুব একটা সহজ হবে না। নিজস্ব রাজনৈতিক এলাকার বাইরে নারী এমপিদের দায়িত্ব দেওয়ার মানে হলো, তাদের স্থানীয় বিএনপি নেতাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। সেই সঙ্গে তৃণমূলের প্রত্যাশাও পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে অন্য দলের নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে দলকে চাঙা রাখতে হবে। সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতারা বলেন, পারিবারিক পরিচিতি, সাংগঠনিক কাজ, নিয়মিত উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব তৈরি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে। ফলে বাইরে থেকে যাওয়া সংরক্ষিত আসনের এমপিদের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের বিরোধ তৈরি হতে পারে। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, তৃণমূলের প্রত্যাশা সামলানোই হবে তাদের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন