ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

স্বপ্ন বড়, ঘাটতিও বড়

মো. আব্দুর রহিম
প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৫:০৮ এএম

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখালেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল্যস্ফীতির অব্যাহত চাপ এবং দীর্ঘদিনের নানা সংকটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন অর্থবছরের জন্য তিনি প্রস্তাব করেছেন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও প্রবৃদ্ধির আকাক্সক্ষা পূরণে রাজস্ব আয়ের বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে অর্থমন্ত্রী পুরোনো ছকেই জনতুষ্টির বিশাল বাজেট দিলেন। মোটাদাগে রাজনৈতিক অঙ্গীকার মাথায় রেখেই প্রস্তাবিত বাজেট দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। এতে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ব্যাপকহারে ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ পরিশোধ বাবদ ব্যয় অত্যধিক হারে বেড়েছে। সে কারণে বাজেটে ঘাটতি বেড়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরে মূল্যস্ফীতির ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার কথাও বলেছেন অর্থমন্ত্রী। 

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তার আগে মন্ত্রিসভা ওই প্রস্তাব অনুমোদন করে। অন্তর্বর্তী সরকার উন্নয়নব্যয় কমিয়ে এনে রুটিন দায়িত্ব সারতে যে বাজেট গত অর্থবছরে দিয়েছিল, তাতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রস্তাবিত ব্যয়ের অংক ছিল আগের অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে কম। সেই সরকারের সময় মূল্যস্ফীতির যে চাপ জনগণের মাথার ওপর ছিল, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চার মাসে তা খুব একটা লাঘব হয়নি। রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটেনি, গতি ফেরেনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও ইরান যুদ্ধের জেরে পশ্চিম এশিয়ার নতুন সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও নতুন অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরেনি, বিনিয়োগে স্থবিরতাও কাটেনি। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও সাহসী হতে চাইছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ আর অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর চেষ্টায় উন্নয়নব্যয় বাড়ানোর পথেই তিনি হাঁটছেন। এবারের বাজেটের শিরোনাম তিনি ঠিক করেছেন : ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা দেশে তৈরি হয়েছে, সেটাকে ধারণ করে এই বাজেট প্রস্তাব করেছেন তারা। সে কারণে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানোসহ নতুন অনেক বিষয় এসেছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে-স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও অর্জন করবে। তার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়নব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা, যা ইতোমধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে। উন্নয়নব্যয়ের পরিমাণ মোট বাজেটের ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালনব্যয় ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এবার পরিচালনব্যয় (খাদ্য হিসাব, ঋণ ও অগ্রিম, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা বিদায়ি অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ৬.৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়নব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি। অনুন্নয়নব্যয়ের আরও প্রায় ১৪.৭৫ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ি অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের ৭৪ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ি অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ২০ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অংক মোট বাজেটের ৬৪ শতাংশের বেশি। গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩.৮৫ শতাংশ। বিদায়ি অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। সংশোধনে তা কমিয়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮২১ কোটি টাকা করা হয়। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ি সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া বিদেশি অনুদান থেকে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, সংশোধনে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়, যদিও এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, বিভিন্ন বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও আমাদের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রাজস্ব আহরণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান উদ্দেশ্য হলেও দেশে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার ক্ষেত্র বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রতিরক্ষণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এজন্য প্রয়োজন একটি ন্যায্য, প্রযুক্তিনির্ভর, সর্বজনীন ও পূর্বানুমানযোগ্য রাজস্ব কাঠামো, যা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্রকে আরও গতিশীল করবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমান। ঘাটতির এই অনুপাত গতবারের সমান।

সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা জোগানোর চাপ থাকায় আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর থেকে প্রতিবারই ঘাটতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ তা ৪ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনেন। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সেই ধারা বজায় রাখলেন।

বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি ঋণের ওপর। তবে চড়া সুদে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ কমাতে আমির খসরু বিদেশি উৎস থেকে গতবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে। বিদায়ি অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সেই লক্ষ্যেও পৌঁছানো যায়নি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১০ মাস মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি ছিল। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কৌশলে তা এক অংকের ঘরে নামানো গেলেও এখনো তা ৯ শতাংশের বেশি। সবশেষ মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে। এজন্য তিনি চাল, ডাল, চিনি, ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর কর ছাড় দিয়েছেন। এসব পণ্যের ওপর এক থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর আছে। সেটি কমিয়ে একই হারে দশমিক পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে এই করছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় আরও ৯টি পণ্য যুক্ত করা হতে পারে। অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। দেশে ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিক বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিদেশ থেকে ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানির শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর ভার ৯৩ শতাংশ আছে। নতুন প্রস্তাবে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ শুল্ক-কর হারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামালে আমদানির ক্ষেত্রে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সব রেয়াতি সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব এসেছে। তবে গ্রাম, ইউনিয়ন, শহর, মহানগরÑ দেশের যেকোনো জায়গা থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যাংক হিসাব খুলতে এনবিআরের টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এসেছে। যদিও কিছু ছাড় থাকছে, যেমনÑ শিক্ষার্থী, পেনশনভোগী, দশ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ প্রয়োজন হবে না।

সবচেয়ে বেশি অর্থ যাচ্ছে কোথায় : ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয় পরিচালন খাতে। আগামী অর্থবছর পরিচালনব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও সংশ্লিষ্ট খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উন্নয়নব্যয়ে ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বরাবরের মতোই অন্যতম বড় খাত হিসেবে থাকছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কর্মসংস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ এ অর্থ থেকে বাস্তবায়ন করা হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।   যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।

সড়ক, সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় হবে। কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষক কার্ড, কৃষি ভর্তুকি এবং খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়নে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। পানিসম্পদ খাতে খাল খনন, নদী পুনরুদ্ধার এবং বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে এক লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বাজেটে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা, ৫-জি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্রীড়া উন্নয়নে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি ও স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণে ২০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতি, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ১০০ কোটি টাকার জলবায়ু তহবিল এবং ধর্মীয় খাতে ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা ও ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য এক হাজার ৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।