২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেটকে একটি উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতাবিবর্জিত বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সংসাদের বিরোধীদলীয় জোট।
একে গণবিরোধী, লুটের এবং দলীয় কর্মী লালনের বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মিছিল করে জামায়াত। একই সঙ্গে আজ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা বলেন।
এদিকে সিপিবির প্রতিক্রিয়া দাবি করেছেÑ এটি একটি বড় ফাঁপা বাজেট, যার মাধ্যমে বৈষম্য বাড়বে। এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকার প্রায় ২ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকার ঘাটতির কথা বললেও বাস্তবে ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে ৪ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কারণ প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অর্জন করা অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, রাজস্ব আদায়ে ২ লাখ কোটিরও বেশি ঘাটতি থেকে যেতে পারে।’ প্রকৃত হিসাব বিবেচনায় এই বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট ঋণনির্ভর ও উচ্চ ঘাটতির বাজেট, যার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না এবং বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তিনি বলেন, বাজেটে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে যে রাজস্ব আদায়ের হিসাব ধরা হয়েছে, তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যারা বাজেট তৈরি করেছেন, তারা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও কষ্ট যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। এ কারণে বাজেটে দরিদ্র ও নি¤œ আয়ের মানুষের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটেনি। জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘বর্তমানে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। এর মধ্যে এই বাজেট বাস্তবায়িত হলে বাজারে আরও চাপ সৃষ্টি হবে এবং দ্রব্যমূল্য বাড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নি¤œ আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষ। তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সংসদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি জনমুখী ও বৈষম্যহীন বাজেট উপস্থাপন করা হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, ‘এই বাজেট গরিববান্ধব নয়। যারা বাজেট প্রণয়ন করেছেন, তারা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। কারণ, মন্ত্রীরা গর্ব করে সংসদে বলেন, তারা গরিব নন, তাদের চারটি গাড়ির চারজন ড্রাইভার আছেন। ফলে নি¤œ আয়ের মানুষের দুর্ভোগ ও চাহিদার প্রতিফলন বাজেটে নেই। এই বাজেট বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের চাপ আরও বাড়বে, যার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হবে গরিব মানুষকে।
এদিকে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘বড় ফাঁপা বাজেট’ উল্লেখ করে স্বাগত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, এই বাজেটে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো আশাবাদ নেই; বরং এটি বৈষম্য আরও বাড়াবে। সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বিবৃতিতে বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অনেক বড় অঙ্কের; কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অসার বা ফাঁপা। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে ঘাটতি মেটাতে নতুন করে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একদিকে নতুন ঋণনির্ভর বড় বাজেট, অন্যদিকে সুদ পরিশোধই অন্যতম প্রধান ব্যয়ের খাত, এটিই বাজেটের অসারতা প্রমাণ করে।
সিপিবির বিবৃতিতে বলা হয়, বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে সরকারের সক্ষমতা নিয়েও আস্থা রাখা যাচ্ছে না। তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে সিপিবি বলেছে, ২০১০-১১ সালে বাজেট ছিল জিডিপির ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এবার টাকার অঙ্কে ৮ গুণ বাড়লেও বাজেট-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে, যা ১৫ বছর আগের তুলনায় কম। করনীতি প্রসঙ্গে সিপিবি বলেছে, আইএমএফের শর্তের আওতায় করের জাল বিস্তৃত করার যে নীতি নেওয়া হয়েছে, তাতে শ্রমিক, কৃষক, নি¤œ ও মধ্যবিত্ত এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সুবিধা পাবে কেবল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীÑ বড় ব্যবসায়ী, ব্যাংক মালিক ও আমদানিকারকেরা।

