বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর অপেক্ষার অবসান ঘটেছে গত রাতে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর পর্দা উঠেছে ২০২৬ ফিফা বিশ^কাপের। আজতেকা স্টেডিয়াম বিশ^ফুটবলের অন্যতম ঐতিহাসিক ভেন্যু। পেলে ও ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের বিশ্বকাপে স্বর্ণালি অধ্যায় এ মাঠেই লেখা হয়েছিল। সেই মাঠেই শুরু হয়েছে নতুন বিশ্বকাপের গল্প। গত রাতের উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর প্রতিপক্ষ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৬ বছর পর আবারও উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি এ দুই দল, একই আবহ। তবে এবার ভিন্ন মহাদেশে, ভিন্ন বাস্তবতায়। দুই মহাদেশের দুই ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতির লড়াই দিয়ে শুরু হয়েছে বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। ঝলকানো আলোর বৃষ্টি, উত্তাল নাচ-গান, প্রায় অর্ধশত দেশের পতাকা আর আবেগ-প্রত্যাশার ভিড়ে বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে মানব জাতির সবচেয়ে বড় উৎসব।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনের জন্য এর চেয়ে বেশি প্রতীকী মঞ্চ হয়তো আর হতে পারত না। আজতেকা স্টেডিয়াম বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে এক কিংবদন্তির নাম। এ মাঠেই ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিল এবং ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের অমর কাব্য রচনা করেছিল। বিশ্বকাপের তিনটি ভিন্ন আসরের ম্যাচ আয়োজনকারী প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবেও ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে আজতেকা। ফলে নতুন বিশ্বকাপের সূচনা হলো এমন এক মাঠে, যেখানে ফুটবলের স্মৃতি শুধু সংরক্ষিতই নয়, জীবন্তও।
উদ্বোধনী ম্যাচে গত রাতে মাঠে লড়াই করেছে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে ধারাবাহিক অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর একটি মেক্সিকো। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে। নিয়মিত নকআউট পর্বে ওঠার সাফল্য থাকলেও বিশ্বকাপ শিরোপা এখনো অধরা। ১৯৯৬ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ের গৌরব অর্জন করা দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান ধীরে ধীরে শক্ত করেছে। উদ্বোধনী ম্যাচে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল চাপমুক্ত থেকে সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা।
এ দুই দলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় সাক্ষাৎ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। সেই উদ্বোধনী ম্যাচ ড্র হয়েছিল ১-১ গোলে। সিপিওয়ে টশাবালালার অসাধারণ গোল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসে উদ্বোধনী রাতের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয়।
স্বাগতিক হিসেবে মেক্সিকোর সামনে প্রত্যাশার চাপ ছিল অনেক বেশি। ঘরের মাঠে দর্শকদের সমর্থন যেমন শক্তি, তেমনি এটি মানসিক চাপও তৈরি করে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ধারাবাহিকভাবে নকআউট পর্বে ওঠার অভিজ্ঞতা থাকলেও অতীতে শিরোপার স্বাদ অধরা মেক্সিকোর। এই অপূর্ণতা প্রতিটি বিশ্বকাপেই তাদের তাড়িয়ে বেড়াত। তবে টেকনিক্যাল দিক থেকে মেক্সিকোর শক্তি সাধারণত দ্রুত উইং আক্রমণ, মাঝমাঠে বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আর সেট-পিসে দক্ষতা।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা মাঠে নেমেছিল কম প্রত্যাশা; কিন্তু উচ্চ আত্মবিশ্বাস নিয়ে। আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম সংগঠিত দল হিসেবে তারা জানত, উদ্বোধনী ম্যাচে হার এড়ানোই হতে পারে বড় সাফল্য। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক এবং শারীরিক শক্তিই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র। খেলা শেষে অবশেষে সেটাই লেখা হলো ইতিহাসের পাতায়, যেটা লেখা ছিল তাদের ভাগ্যে।
এতদিন কাগজে-কলমে সামান্য এগিয়ে রাখা হয়েছিল স্বাগতিক মেক্সিকোকে। এই দল জানত, পরিচিত পরিবেশ, দর্শক সমর্থন এবং অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার অভ্যাস তাদের সুবিধা দেবে। তবে ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতবাদে তারা উদ্বিগ্নও ছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, উদ্বোধনী ম্যাচ সব সময়ই অপ্রত্যাশিত। চাপ, আবেগ ও প্রথম ম্যাচের নার্ভÑ সব মিলিয়ে ফলাফল অনেক সময় কৌশল নয়, মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আজতেকা স্টেডিয়ামের বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চতা ও পরিবেশ, যা অনেক সময় অতিথি দলের জন্য শারীরিকভাবে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে। মেক্সিকো এই সুবিধাকে ভালোভাবে কাজে লাগাবে বলে চূড়ান্ত করে। মাঠে নামার আগেই তাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট হিসেবে ধরে নেয়।
ফুটবল বিশ্লেষক বা বোদ্ধারা খেলা শুরুর আগে থেকেই বলে আসছিলেন, মেক্সিকো জিতলে এটি হবে স্বাগতিকদের জন্য আদর্শ সূচনা, উৎসবমুখর দেশ ও আত্মবিশ্বাসী টুর্নামেন্ট যাত্রার ইঙ্গিত। অপরদিকে ক্ষিণ আফ্রিকা জিতলে তা হবে টুর্নামেন্টের প্রথম বড় চমক। বলা চলে, আফ্রিকান ফুটবলের জন্য ঐতিহাসিক বার্তা। আর ড্র হলে সেটি দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য স্বস্তি এবং মেক্সিকোর জন্য চাপের সূচনা হিসেবে দেখা হবে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ফলাফল সব পরিষ্কার করে দিল। স্বাগতিক মেক্সিকো শুরু থেকেই ছিল প্রত্যাশার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে। মেক্সিকোর জন্য বিশ্বকাপ মানেই বাড়তি চাপ। ঘরের মাঠে খেলা মানে সমর্থকদের প্রত্যাশার চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া। আজতেকার গ্যালারি লাল-সবুজ জার্সির ঢেউয়ে ভরা থাকলেও মাঠে নামার আগে তাদের টেনশন ছিল, সেই ঢেউ কোথায় গিয়ে আছড়ে পড়ে।
দক্ষিণ আফ্রিকা শুরু থেকেই ছিল চাপহীন, কিন্তু বিপজ্জনক। তারা মাঠে নেমেছিল তুলনামূলক কম প্রত্যাশার বোঝা নিয়ে। আফ্রিকান ফুটবলের এই দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবলের জন্য পরিচিত। তাদের মূল শক্তি হলো দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক, শারীরিক সক্ষমতা ও স্ট্যামিনা, দলগত ডিসিপ্লিন এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা। ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ তাদের খেলাকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলে।
মেক্সিকো শুরু থেকেই বলের দখল রেখে খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। গ্যালারিভর্তি সমর্থকদের উচ্ছ্বাস তাদের আক্রমণে বাড়তি শক্তি জুগিয়েছিল। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা অপেক্ষা করেছে সুযোগের। সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপর ভর করে তারা ম্যাচে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাস বলে, প্রথম ম্যাচে অনেক সময় ফেভারিটরা প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারে না। কারণ মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি তাদের মোকাবিলা করতে হয় স্নায়ুচাপও। গত রাতের ম্যাচেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে। দুই দলই জানত, প্রথম ম্যাচের ফল পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
তবে একটি ম্যাচের ফলাফলই বিশ্বকাপের গল্প নয়। বরং এটি কেবল শুরু। আগামী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাজুড়ে চলবে ফুটবলের এই মহোৎসব। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের প্রতিটি দিনই নিয়ে আসবে নতুন নাটক, নতুন নায়ক এবং নতুন গল্প।
এবারের আসরে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো-পরবর্তী যুগের নতুন তারকাদের দিকে থাকবে সবার নজর। কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহ্যাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, লামিন ইয়ামাল, জামাল মুসিয়ালা, ফিল ফোডেন, ফেডেরিকো ভালভার্দে কিংবা আরলিং হালান্ডদের মতো ফুটবলারদের কাঁধেই এখন বিশ্বফুটবলের ভবিষ্যৎ। তাদের পায়ের জাদুতে আগামী দিনগুলোতে জন্ম নিতে পারে নতুন কিংবদন্তির গল্প। গত রাতে আজতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে সেই মহাযজ্ঞ। আগামী ১৯ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এক বলের পেছনে ছুটবে, জেগে থাকবে রাত, থমকে যাবে ব্যস্ততা। কারণ বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়Ñ এটি আবেগ, স্বপ্ন, জাতীয় গৌরব আর মানবজাতির সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের নাম।

