নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে বড় সংকট দেখছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াত ও তাদের শরিকেরা।
দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ঘাড়ে এটি ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষী বাজেট, যা লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি তারা দাবি করছেন, এটি বিএনপির নেতাকর্মীদের লুটপাটের বাজেট হবে।
দীর্ঘ অনেক বছর পর ক্ষমতায় বিএনপি। ক্ষমতার পালাবদলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে জনগণ। সেই স্বপ্নপূরণে বিশাল বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সব পক্ষকে খুশি করতে রয়েছে রকমারি ছাড়। প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়েই এটি প্রণয়ন করা হয়েছে বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
যদিও বাজেটের সাফল্য, এর আকারে নয়, বরং বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এদিকে, বাজেটকে জনবান্ধব আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল করেছে বিএনপির নানা অঙ্গ সংগঠন। দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, এই বাজেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বর্তমান আর্থিক কাঠামো দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতিতে বাজেটের সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে।
বাজেট প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকারের ঘোষিত নতুন বাজেটে (প্রস্তাবিত) দেশের অর্থনৈতিক কোনো সংস্কার হবে না। বাজেটে ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা মূলত বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান যে কর বা রাজস্ব আদায়ের কাঠামো রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
সরকারের এই বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক আরও বলেন, ‘আশা করেছিলাম এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে; কিন্তু বর্তমান বাজেটের যে রূপরেখা, তাতে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব হবে না।’
বাজেটের ইতিবাচক দিক নিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু পণ্যের কর কমানো হয়েছে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’
এদিকে বাজেট বাস্তবায়নে বড় বাধা দেখছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়; লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত তিন মাসে গ্যাস, জ¦ালানির দাম দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দামও বেড়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে দ্বিতীয় বড় বাধা লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি।’ একই সঙ্গে বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব বাধার কারণে বাজেট বাস্তবায়নসহ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সরকারের জন্য ‘খুব কঠিন’ হবে বলে দাবি করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি আরও বলেন, ‘কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।’
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করার পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি ও সংকট সৃষ্টি করবে। এই ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।’
সরকারের এই বাজেট মূলত জনগণকে পরিসংখ্যানের মোড়কে বিভ্রান্ত করার একটি প্রচেষ্টা মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রকৃত চাহিদা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে একটি গতানুগতিক ও ঋণনির্ভর বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে রাজস্ব আদায়ের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং মধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
বাজেট নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ মেগা বাজেট হতে পারে, কিন্তু এটি মূলত দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল করার এক উচ্চাভিলাষী চিন্তা’।
তিনি আরও বলেন, ‘বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল ঘাটতি ধরা হয়েছে, তা পূরণের জন্য সরকার এখন বৈদেশিক দাসত্ব এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর দেদার হাত বাড়াবে।’
‘দেশের মানুষ লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, ব্যাপক বেকারত্ব, বিনিয়োগের ভয়াবহ সংকট এবং শিল্প ও কৃষি খাতের চরম স্থবিরতায় দিশাহারা। সরকার যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার রূপকথা শোনায়, তখন বাজার বাস্তবতায় তা জনগণের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো শোনায়।’ বলেন তিনি।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম শায়খে চরমোনাই বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলবে এবং অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করবে’। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ঢোল, তবলা ও নৃত্য শেখানোর উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
তবে বাজেটের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এ বাজেট কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়; দেশের সব মানুষের প্রয়োজন, সম্ভাবনা ও জীবনমানের উন্নয়ন সামনে রেখেই এটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কৃষক, নারী, শিল্পী, থিয়েটারকর্মী, কামার-কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ সমাজের এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই, যাদের কথা এবারের বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, যা মূলত পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর ছিল। কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থেকে গেছে। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন