× UCB Sticker Card
বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. সায়েম ফারুকী

প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ১০:২৬ পিএম

বন্দরে ভানুমতির খেল

মো. সায়েম ফারুকী

প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ১০:২৬ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। এই বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম ঘিরে সচল থাকে দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা। অথচ সেই বন্দরেই বার্থ অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগকে ঘিরে সামনে এসেছে এক বিস্ময়কর চিত্র। অভিযোগ উঠেছে, মুক্ত প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করে গুটি কয়েক পুরোনো অপারেটরের একচ্ছত্র আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়ালে চলছে সুপরিকল্পিত এক খেলা।

একদিকে নতুন লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম রহস্যজনকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদিকে অনেকটা নীরবে ও তড়িঘড়ি করে পাঁচ বছরের জন্য বার্থ অপারেটর নিয়োগের মেগা টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নতুনদের বাদ দিয়েই কি আগেভাগে পুরোনোদের জন্য ব্যবসার মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে? এই বিতর্ক এখন আদালতের দরজায়। আর হাইকোর্টও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছেন।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, বন্দর কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানো এবং বার্থ অপারেটরদের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনতে ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন ‘শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্সিং নীতিমালা’ প্রণয়ন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। একই দিন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্স প্রদানেরও বিজ্ঞপ্তি দেয়। লাইসেন্স গ্রহণে ইচ্ছুক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন দাখিল করতে বলা হয়। দেশের বিভিন্ন লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান এতে আগ্রহ দেখায়।

আবেদনকারীদের মধ্যে ছিল দেশের অন্যতম শীর্ষ লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান ভার্টেক্স অফ-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র, আর্থিক সক্ষমতার সনদ, যন্ত্রপাতির তথ্য এবং ১ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিয়ে নিয়ম মেনেই লাইসেন্সের আবেদন করে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে। কিন্তু এরপরই বদলে যায় দৃশ্যপট।

নতুন আবেদনগুলো যখন যাচাই-বাছাইয়ের শেষ পর্যায়ে, তখন চলতি বছরের ৩ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে বার্থ ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের নতুন লাইসেন্স প্রদানের সব কার্যক্রম স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। চবক শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব রাসনা শারমিন মিথি স্বাক্ষরিত ওই অফিস আদেশে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও বার্থ অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে একটি তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকায় ওই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাইসেন্স প্রদানের সব কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখতে বলা হয়। একটি ‘তদন্তাধীন বিষয়’-এর কথা বলা হলেও কী সেই বিষয় কিংবা কেন পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ করা হলো, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

একই দিন (৩ মার্চ ২০২৬) ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকায় একটি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি (তারিখ: ০২.০৩.২০২৬) প্রকাশ করে দরপত্র আহ্বান করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের সাধারণ কার্গো বার্থ নং ২, ৩, ৪, ৫, ৭ এবং ৮-এ (কনটেইনার ছাড়া) কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদে একজন বার্থ অপারেটর নিয়োগের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়।

বিষয়টিকে সবেচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, যেদিন নতুন লাইসেন্স প্রদান স্থগিত করা হলো, ঠিক সেদিনই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক বিভাগ পাঁচ বছরের জন্য সাধারণ কার্গো বার্থ পরিচালনার দরপত্র আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

এদিকে গত ১৮ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থানীয় দৈনিক আজাদী পত্রিকায় একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এতে উল্লেখ করা হয়, বন্দরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ ও অন্যান্য অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করছে বলে তাদের নজরে এসেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে অনুমোদিত লাইসেন্সিং নীতিমালা-২০২৫ অনুসরণ করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত শর্ত পূরণকারী এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনই কেবল বিবেচনায় নেওয়া হবে। চবক আরও স্পষ্ট করেছে, সরকারি বিধিবিধান, নীতিমালা ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ, তদবির কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ নেই। বিজ্ঞপ্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা পরিচিত ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পা না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় সংশ্লিষ্টদের।

এখানেই দেখা দেয় বড় প্রশ্ন। যদি নতুন লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম স্থগিত থাকে, তাহলে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে টেন্ডারে অংশ নেবে? আর যদি অংশ নিতে না পারে, তাহলে এই টেন্ডার কার জন্য?

এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি জানতে পেরে গত ২৬ এপ্রিল ভার্টেক্স অফ-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেড হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। রিট আবেদনের শুনানি শেষে গত ১০ মে হাইকোর্ট বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে রুল জারি করেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না; পাঁচ বছরের জন্য বার্থ অপারেটর নিয়োগের টেন্ডার কেন বাতিল করা হবে না; আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না- আদালত বিবাদীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বন্দরের কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া আপাতত চলতে পারবে বলে জানিয়েছেন। তবে সেটি চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।

আইনজীবীদের দাবি, পুরো ঘটনাটি সংবিধানের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, আবেদনকারীদের কাছ থেকে ফি ও নথি গ্রহণ করে পরে কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা বৈষম্যমূলক আচরণ। এতে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনি সুরক্ষা লাভের অধিকার এবং স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে গত ১১ জুন চবকের পরিচালক ট্রাফিক স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে অংশগ্রহণে ইচ্ছুকদের ৩০ জুনের মধ্যে আবেদন দাখিল করতে বলা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, আগের আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দের আবেদনকারীকে কাজটি পাইয়ে দেওয়ার জন্য এমন পাঁয়তারা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। এখানকার প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে জাতীয় বাণিজ্যে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আধুনিক বিশ্বের বন্দরে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হয় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে উল্টো নতুনদের আটকে রাখার অভিযোগ উঠছে। তাদের মতে, যদি গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার জন্য নীতিমালা, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ও টেন্ডার প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা শুধু নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য নয়, পুরো দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশের জন্যও অশনিসংকেত।

এসব বিষয়ে চবকের পরিচালক ট্রাফিক জি এম সারোয়ারুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কথা বলার কোনো এখতিয়ার নেই।’

জানতে চাওয়া হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাসির উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘যারা আগে আবেদন করেছিলেন, তাদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না। তাদের আগের আবেদনই বিবেচ্য থাকবে। এখানে কোনো রকম স্বজনপ্রীতি কিংবা কারচুরির প্রশ্নই আসে না।’

এদিকে বন্দরসংশ্লিষ্ট একাধিক বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, এটি নিছক প্রশাসনিক অসংগতি নয়, বরং নতুন প্রতিযোগীদের বাজারের বাইরে রেখে পুরোনো অপারেটরদের সুবিধা দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই কার্গো হ্যান্ডলিং খাতে গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে প্রবেশ করলে প্রতিযোগিতা বাড়ত, সেবার মান উন্নত হতো এবং কার্গো খালাসের ব্যয়ও কমে আসত। কিন্তু সেই সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই লাইসেন্সের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের বাইরে রেখে টেন্ডার আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো অপারেটরদের ব্যবসা নিরাপদ রাখা। একজন বন্দর বিশ্লেষক বলেন, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিযোগীদের মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

Link copied!