২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি সারা দেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বই বিতরণের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ইতিমধ্যে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপানোর জন্য দরপত্রও আহ্বান করেছে এনসিটিবি।
চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অষ্টম ও নবম শ্রেণির দরপত্রও আহ্বানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি রয়েছে এনসিটিবির। বই ছাপানোর সব প্রক্রিয়া শেষ করে মধ্য ডিসেম্বর অথবা সর্বোচ্চ ১ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে চায় এনসিটিবি। কিন্তু বই ছাপার কাজ করা প্রেসগুলো এখনো চলতি বছরের প্রাথমিকের বই ছাপার ২০ শতাংশ বকেয়া টাকাই পায়নি। চলতি মাসের মধ্যে বকেয়া টাকা না পেলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না প্রেসগুলো। উল্টো প্রেসগুলোর ঋণের ওপর সুদের বোঝা আরও বাড়বে। এ ছাড়া আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার টেন্ডারে অংশ নিতে প্রেসগুলো ব্যাংক গ্যারান্টি পাবে না। প্রেসগুলোর বকেয়া পাওনা ঘিরে সৃষ্টি হওয়া এমন জটিলতায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই বিতরণে এনসিটিবির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জটিলতার নেপথ্যে বইয়ের ফর্মার বিল
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার দরপত্র আহ্বান, প্রেসের সঙ্গে চুক্তিসহ সব কাজ করে এনসিটিবি। এই হিসেবে প্রেসগুলোর বিল পরিশোধের দায়িত্ব এনসিটিবির। মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার বিল এনসিটিবির বাজেট থেকে দেওয়া হলেও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার বিল দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। প্রাথমিকের বই ছাপার ক্ষেত্রে ফর্মা কম-বেশি হওয়া স্বাভাবিক। আগে ফর্মা কম-বেশি হলে সে অনুযায়ী বিল সমন্বয় করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকে যেসব বইয়ের ফর্মা কমেছে, তা সমন্বয় করা হলেও যেসব বইয়ে ফর্মা বেড়েছে, সেগুলোর অতিরক্ত বিল সমন্বয় করতে চাইছে না ডিপিই।
নিয়ম অনুযায়ী যেসব প্রেস বই ছাপার কাজ পায়, কাজ চলাকালীন তারা ৮০ শতাংশ বিল উত্তোলন করতে পারে। বাকি ২০ শতাংশ বিল পায় পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলাই) এজেন্টের প্রতিবেদন দেওয়ার পর। পিএলআইয়ের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে প্রেসের বিল পরিশোধ করা হয়। জটিলতা বেঁধেছে, এই ২০ শতাংশ বিল নিয়ে। প্রেসগুলো যেসব বইয়ের ফর্মা কম-বেশি হয়েছে সে অনুযায়ী বিল জমা দিয়েছে। এই ২০ শতাংশ বিলের মধ্যে বর্ধিত ফর্মার টাকাও অন্তর্ভুক্ত আছে।
প্রেস সূত্রে জানা গেছে, ন্যূনতম দুই থেকে চার ফর্মা বেড়েছে বইয়ের কলেবর। আর প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ করা ৬৪ প্রেসের বর্ধিত ফর্মার বিল প্রায় ২২ কোটি টাকা। ডিপিই এই বর্ধিত ফর্মার টাকা দিতে রাজি নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে ডিপিই বলছে, প্রাথমিকের বই ছাপার জন্য যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, বর্ধিত ফর্মার অতিরিক্ত ২২ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অন্যদিকে এ বিষয়ে অর্থ সংস্থানের জন্য মন্ত্রণালয়ের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তাই এই জটিলতায় আটকে আছে প্রেসগুলোর ২০ শতাংশ বকেয়া বিল।
এদিকে প্রেসগুলো বলছে, বর্ধিত ফর্মার অতিরিক্ত বিলের বিষয়টির অনুমোদন নেওয়া বা জানানোসহ সব কাজ মন্ত্রণালয়, ডিপিই ও এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ দাপ্তারিক কাজ। এ ক্ষেত্রে বই ছাপার কাজ করা প্রেসের দায় কোথায়? প্রেসগুলোকে কাজ করার পরও কেন বিলের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হবে?
বকেয়া বিল পেতে এনসিটিবি-প্রেস বৈঠক
গত বছরের ডিসেম্বরে প্রাথমিকের বই সরবরাহের পর গত ছয় মাসেও ২০ শতাংশ বকেয়া টাকা না পাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে ছাপার কাজ করা ৬৪ প্রেসের। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই প্রেসগুলোর বকেয়া ২০ শতাংশ টাকার জন্য প্রতিদিন ব্যাংককে সুদ দিতে হচ্ছে ৪ লাখ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে সব প্রেসের ভোগান্তি হলেও ছোট ও মাঝারি প্রেসগুলোর দুর্দশা বেশি। একাধারে ছয় মাস ধরে ব্যাংকের ঋণের সুদ গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে টেন্ডারে অংশ নিতে না পারার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রেসগুলোর দাবি, দ্রুত তাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করে আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার কাজ সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।
বকেয়া পাওনা ঘিরে সৃষ্ট জটিলতা সমাধানের জন্য বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে মতিঝিলে বোর্ডের অডিটোরিয়ামে এনসিটিবির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ফখরুল মাওলার সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতারাসহ প্রেসগুলোর স্বত্বাধিকারীরা। বৈঠকে চেয়ারম্যানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এনসটিবির সদস্য প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু, প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর, এনসিটিবি সচিব প্রফেসর শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান।
বৈঠকে মুদ্রণ সমিতির নেতারা ও একাধিক প্রেসের স্বত্বাধিকারীরা বলেন, সরকারের বিনা মূল্যের বই বিতরণ কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে তারা সব সময়ই আন্তরিক ছিলেন। আগামী শিক্ষাবর্ষের বই এনসিটিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা যাতে নির্দিষ্ট সময়ে পায়, সে জন্য তাদের পক্ষে যা করা দরকার সব করবেন। তবে বইয়ের বর্ধিত ফর্মার টাকাসহ ২০ শতাংশ বকেয়া পাওনা না পেলে প্রেসগুলোর পক্ষে কাজ করা কষ্টকর হয়ে উঠবে।
তারা আরও বলেন, বইয়ের ফর্মা কম-বেশি হলে সে অনুযায়ী তারা আগেও বিল পেয়েছেন। কিন্তু এবারই ফর্মা কম হলে টাকা কেটে রাখলেও বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে বিলের অতিরিক্ত টাকা দিতে চাইছে না প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। প্রেস মালিকদের পুঁজির স্বল্পতা রয়েছে। এতে ব্যাংকের সঙ্গে প্রেসগুলোর ট্রানজিকশন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রেসগুলোর কাছে ব্যাংকের দায়-দেনা বাড়ছে বলেও তারা হতাশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। তাদের বিষয়টি অবহিত করেছেন।
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদির এনসিটিবির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানকে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে প্রেসগুলোর বকেয়া পাওনা নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানের অনুরোধ জানান। পরে এনসিটিবি চেয়ারম্যান এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করবেন বলে জানান।
এদিকে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট আনোয়ার হোসেন পত্তনদার বলেন, ‘আমরা ওয়ার্ক অর্ডারের শর্ত অনুযায়ী কাজ করেছি। কিন্তু বর্ধিত ফর্মার বাড়তি টাকা দিতে চাইছে না। এটা আমাদের জন্য খুব কষ্টের।’ বকেয়া পাওনার জটিলতায় আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপায় কোনো প্রভাব পড়বে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হয়তো প্রভাব পড়বে না, তবে বিল না পেলে আমাদের কষ্ট বাড়বে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন