পাবনায় ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, লালমনিরহাটের আদিতমারীতে ডিসি-এসপির গাড়ি ভাঙচুর, নরসিংদীতে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে প্রকাশ্যে গুলি, রাজধানীর আদাবরে ওসির ওপর চাপাতি নিয়ে হামলা, ময়মনসিংহে ধর্ষণের পর শিশুকে নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ, ঢাকাজুড়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিস্তার- দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি আবারও এক অনিশ্চিত ও অস্থির মোড়ে দাঁড়িয়ে?
ঘটনাগুলোর পটভূমি ভিন্ন। কোথাও জনতার ক্ষোভ, কোথাও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, আবার কোথাও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সব কিছুর মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাচ্ছেন অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা এবং অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে গেলে সমাজে এমন পরিস্থিতির জন্ম নেয়; যেখানে জনতা বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং অপরাধীরা প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনে উৎসাহিত হয়।
শুধু রাজধানীতেই চলতি মাসের প্রথমার্ধে প্রায় ১০০ ছিনতাইয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, নাকি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার গভীরে জমে ওঠা সংকটের বহিঃপ্রকাশ?
জনতার আদালত : আইনের প্রতি আস্থাহীনতার প্রতিফলন : সম্প্রতি পাবনায় এক ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা না রেখে ক্ষুব্ধ জনতা নিজেরাই শাস্তি কার্যকর করার পথে হাঁটে। এর কিছুদিনের মধ্যেই লালমনিরহাটের আদিতমারীতে একই ধরনের উত্তেজনা ভয়াবহ রূপ নেয়। সেখানে অভিযুক্তদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। কারণ আইনের শাসন দুর্বল মনে হলে মানুষ বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের পরিবর্তে জনতার শক্তির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।
তাদের ভাষায়, মব জাস্টিস কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। কারণ একবার জনতা বিচার করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নিলে তার সীমা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আজ অভিযুক্তের বাড়ি পুড়ছে, কাল নিরপরাধ কেউ জনরোষের শিকার হতে পারে।
নরসিংদীর ঘটনা কেন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে : সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি নরসিংদীর সংঘর্ষ। হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা একদল ব্যক্তির প্রকাশ্যে গুলি চালানোর অভিযোগে একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে, প্রস্তুতি ও সংগঠিত উপস্থিতি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক সংঘর্ষের চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত শক্তি প্রদর্শনের ইঙ্গিত দেয়।
তারা প্রশ্ন তুলছেন, কারা এমন সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর সাহস পেল? তাদের পেছনে কি কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী রয়েছে? যদি থাকে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য আরও বড় সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশে অতীতেও রাজনৈতিক ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব সশস্ত্র বলয় তৈরির নজির রয়েছে। ফলে এমন দৃশ্য অনেককেই পুরোনো আশঙ্কার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
পুলিশের ওপর হামলা : কর্তৃত্ব কি কমছে : কয়েক বছর আগেও থানার ওসির ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা কল্পনা করা কঠিন ছিল। কিন্তু রাজধানীর আদাবরে সম্প্রতি এক বিকাশ ব্যবসায়ীর টাকা লুটের ঘটনায় জড়িতদের ধরতে গেলে থানার ওসিসহ দুই পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন। ওসিকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি চালায়।
স্থানীয়দের মতে, ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং অপরাধীদের মধ্যে পুলিশের প্রতি ভয় কমে যাওয়ার একটি প্রতীকী উদাহরণ।
আদাবরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী হাজী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘দিনের আলোয় টাকা লুট হচ্ছে, আবার পুলিশ গেলে তাদের ওপর হামলা হচ্ছে। পুলিশই যেখানে আক্রান্ত, সেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা চাইবে কার কাছে?’ তার অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলছে।
মোহাম্মদপুর-আদাবর : অপরাধের পুরোনো মানচিত্র কি ফিরছে : মোহাম্মদপুর ও আদাবর দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকায় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষ করে জেনেভা ক্যাম্পকে ঘিরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ নতুন নয়। সন্ধ্যার পর এলাকায় ছিনতাইকারীদের সক্রিয়তা বাড়ে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি করলেও স্থানীয়দের একাংশ মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযানগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হচ্ছে।
মাদক অর্থনীতি : অপরাধের প্রধান জ্বালানি : অপরাধবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি বহু অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তি। মাদক ব্যবসা থেকে আসা অর্থ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অস্ত্র কেনাবেচা এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দাবি বাস্তবে সফল হওয়া কঠিন। তাদের মতে, রাজধানী থেকে জেলা শহর- সবখানেই অপরাধের সঙ্গে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।
নৃশংস অপরাধের বিস্তার : শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করছে সমাজকে। সম্প্রতি ময়মনসিংহে ধর্ষণের পর এক শিশুকে নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, অপরাধীরা যখন মনে করে ধরা পড়ার ঝুঁকি কম কিংবা প্রভাব খাটিয়ে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা সম্ভব, তখন অপরাধ আরও নৃশংস রূপ ধারণ করে। তাদের ভাষায়, অপরাধের ভয়াবহতা যেমন উদ্বেগের বিষয়, তেমনি অপরাধীর মানসিকতায় শাস্তির ভয় কমে যাওয়াও সমান উদ্বেগজনক।
পুলিশ কি এখনো ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি : সাবেক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুর রহিম খান মনে করেন, গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পুলিশের একটি অংশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর পুলিশের মধ্যে এক ধরনের ট্রমা তৈরি হয়েছিল। কিছু সময় তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে এখন আবার পুরোনো ধ্যানধারণা ও চর্চায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অপরাধ দমনের চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগই বেশি শোনা যাচ্ছে।’
তার মতে, মাঠ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা নতুন কর্মস্থলে থাকায় স্থানীয় বাস্তবতা বুঝতে সময় লেগেছে। একই সঙ্গে পুলিশের ভেতরের সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়াও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে।
তিনি বলেন, ‘জনগণ যখন পুলিশকে দুর্বল বা অকার্যকর মনে করে, তখন তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করে। তাই সবার আগে প্রয়োজন পুলিশি ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার।’
লুট হওয়া অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের পুনর্গঠন : নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহলে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়া।
যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই, তবু বিভিন্ন সূত্রে এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ এসব অস্ত্র সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
একই সঙ্গে বিভিন্ন মামলায় জামিনে মুক্ত হওয়া কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী আবারও এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নতুন পৃষ্ঠপোষকতা খোঁজে। সেই সুযোগ তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
সবচেয়ে বড় সংকেত কী : বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দুটি দিক হলো- আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর পুনর্গঠন।
এই দুটি প্রবণতা একসঙ্গে শক্তিশালী হলে আইনের শাসন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে থাকবে জনতার বিচার, অন্যদিকে সংগঠিত সন্ত্রাস। মাঝখানে দুর্বল হয়ে পড়বে রাষ্ট্রীয় আইন কাঠামো।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ- কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সমাধান নয় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশে অপরাধের ধরন বদলে গেছে।
তিনি বলেন, ‘একসময় অভাব বা মাদকের কারণে অপরাধ বেশি হতো। এখন পেশাদার অপরাধী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। ফলে পুরোনো পদ্ধতিতে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ব্যবস্থাগত ও প্রক্রিয়াগত সংস্কার জরুরি।’
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘মানুষ এখন খুন, চুরি ও ছিনতাইয়ের ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন অপরাধ মানুষের মনে গভীর অনিরাপত্তা তৈরি করে। সরকারের উচিত এ বিষয়ে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।’
শেষ কথা : সরকারি সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। কারণ প্রশ্নটি শুধু অপরাধ বৃদ্ধির নয়, প্রশ্নটি মানুষের আইনের প্রতি আস্থার।
যখন অপরাধীরা প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শন করে, পুলিশ হামলার শিকার হয়, জনতা বিচারকের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয় এবং সমাজে শাস্তির ভয় কমে যায়- তখন তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, আইনের শাসনের সংকেতও বহন করে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- পুলিশ কি হারানো মনোবল ফিরে পাবে, নাকি পুরোনো সংস্কৃতির বৃত্তেই আটকে থাকবে? আর রাষ্ট্র কি জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন করতে পারবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামীদিনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন