রাজধানীর আদাবরে বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাই এবং পরে অভিযানে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় ছয়জনকে আটক করেছে র্যাব। মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকা থেকে তাদের আটকের তথ্য গতকাল বুধবার কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিংয়ে তুলে ধরা হয়।
আটক ব্যক্তিদের একজন ফরিদ আহমেদ বাবু ওরফে এক্সেল বাবু, যাকে মোহাম্মদপুরের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বলছে র্যাব। অন্যরা হলেনÑ কবজিকাটা গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড আবু সাঈদ, রাশেদ খন্দকার, মো. লিটন, মো. তৌসিফ ও মো. তরিকুল ইসলাম। র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান ব্রিফিংয়ে বলেন, আবু সাঈদ জিজ্ঞাসাবাদে নিজেকে ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ গ্রুপের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ পরিচয় দিয়েছেন। এক্সেল বাবু ‘কবজিকাটা’ আনোয়ারেরও গুরু। ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনার কথা তারা স্বীকার করেছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল ও একটি সামুরাই সোর্ড উদ্ধারের কথা জানিয়েছে র্যাব।
আদাবরে একজন এমএফএস এজেন্টকে গত মঙ্গলবার সকালে কুপিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীর। ওই ঘটনায় বিকেলে অভিযানে গেলে আদাবর থানার ওসি ও একজন এসআইকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়। এ সময় পুলিশ গুলি ছুড়লে সন্দেহভাজন দুজন আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে রুবেল, কাশেম, আমির ও জয় নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে আমির ও রুবেল পুলিশের গুলিতে আহত হন। সব মিলিয়ে ওই ঘটনায় ১০ জন গ্রেপ্তার হলেন।
এদিকে শ্যামলীর বিকাশ দোকানে হামলা এবং প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় আহত ব্যবসায়ী এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার অবস্থাও গুরুতর বলে জানা গেছে। মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা যাদের গ্রেপ্তার করেছি, তাদের মধ্যে তিনজন ছিনতাইকারী এবং একজন ওই প্লটের কেয়ারটেকার। কেয়ারটেকার কাসেম তাদের তিন-চার দিন ধরে ওই প্লটে আশ্রয় দিয়েছিল। ফলে তাকেও আটক করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে সেও জড়িত। আহত পুলিশ সদস্যদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কবজিকাটা গ্রুপের সঙ্গে এক্সেল বাবুর সম্পৃক্ততার বিষয় জানতে চাইলে র্যাব-২-এর অধিনায়ক বলেন, ‘কবজিকাটা গ্রুপের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী এক্সেল বাবুর সম্পৃক্ততা সে নিজেই স্বীকার করেছে। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়ে আসছিল। এক্সেল বাবুর মতো পৃষ্ঠপোষকদের আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আটক করতে না পারব, ততক্ষণ এই গ্যাংগুলো অ্যাকটিভ হতে থাকবে। এ কারণে আমরা একটু অ্যাগ্রেসিভ পুলিশিং করতে চাই। র্যাব-২-এর গোয়েন্দা দল ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে।’
এ ধরনের ছিনতাইকারী ও অপরাধ কন্ট্রোল করা এবং দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার বিষয় র্যাব কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে জানতে চাইলে র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্প্রতি পল্লবীতে একটি শিশু হত্যা ও ধর্ষণ মামলা খুব দ্রুত সময়ে আদালতে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত শেষ হয়েছে। এ ধরনের কোনো প্রসেস যদি ছিনতাইকারী এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে করা যেত, তাহলে আমার মনে হয় জনগণ আরও বেশি নিরাপদ বোধ করত। শুধু আমরা (র্যাব) আটক করি, তদন্ত করি। পুরো প্রচেষ্টা ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের একটা অংশ। বাকি সিস্টেম যারা সংশ্লিষ্ট তারা ভেবে দেখতে পারে। আমার মনে হয় এতে করে আমরা উপকৃত হব।’
মোহাম্মদপুরকে বলা হয় অপরাধের হাব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার কারণে মোহাম্মদপুরে অপরাধীরা সক্রিয় হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে র্যাব-২-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোহাম্মদপুরে দুর্বল না। তবে অপরাধীরা একটা সুযোগ নিচ্ছে। এ কারণে আমরাও আভিযানিক টেকনিক পরিবর্তন করছি, যাতে অপরাধীরা সুবিধা করতে না পারে। মোহাম্মদপুরে অপরাধীরা রাজনৈতিক শেল্টার পাচ্ছে কি নাÑ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের সুযোগ কম। কারণ নতুন সরকার এ ধরনের কর্মকা-ের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। যদি কেউ জড়িত থাকে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
ওসি-এসআইকে কোপানোর আগে ইয়াবা সেবন করছিল হামলাকারীরা : সন্দেহভাজন আসামি ধরতে গিয়েছিল পুলিশ। তবে তারা ছিলেন সাদা পোশাকে। ফলে এলাকার অনেকেই তাদের পুলিশ হিসেবে চিনতে পারেননি। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, শ্যামলীর একটি বিকাশ দোকানে হামলা ও টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা ঢাকা উদ্যানের একটি পরিত্যক্ত প্লটের ভেতরে থাকা টিনশেড ঘরে অবস্থান করছে। তথ্যের ভিত্তিতে চার পুলিশ সদস্য প্লটটির কেয়ারটেকারকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। আদাবর থানার এসআই তরুণ কুমার ঘোষ প্রথমে ভেতরে ঢুকতেই তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তিন সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীর একজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপাতে শুরু করে। তার চিৎকার শুনে আশপাশে থাকা অন্য পুলিশ সদস্যরা ছুটে আসেন। পরে ওসিসহ অন্যরা এগিয়ে গেলে তাদের ওপরও চাপাতি দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে ওসি ও এসআই আহত হন। পুলিশ সদস্যদের আহত অবস্থায় দেখে একজন এসআই পিস্তল বের করে গুলি ছোড়েন। এতে পালানোর চেষ্টা করা দুই সন্দেহভাজন আহত হয়। পরে তিনজন সন্দেহভাজন এবং প্লটটির কেয়ারটেকারকে আটক করে পুলিশ। তবে ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলোÑ স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, পুলিশের ওপর হামলার আগে টিনশেড ঘরের ভেতরে কাঠের একটি চৌকিতে বসে ইয়াবা সেবন করছিল ওই তিন যুবক। গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং এলাকাবাসী, প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
যে প্লটে ঘটেছে ঘটনা : বেড়িবাঁধ থেকে গাবতলীমুখী সড়কে ঢাকা উদ্যান এলাকায় একটি তেলের পাম্পের পাশ দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে ডান দিকে বাঁক নেওয়া একটি রাস্তার সামনে ডেলটা গার্মেন্টস। রাস্তার বাঁকের মুখেই প্লটটির অবস্থান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাসখানেক আগেও সেখানে রিকশা রাখার গ্যারেজ ছিল। সম্প্রতি প্লটটি ১৮ জন ব্যক্তি কিনে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ডিএমপির একজন নারী এসপিও রয়েছেন। ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় প্লটটির দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় আবুল কাসেম নামে এক ব্যক্তিকে। তিনিই পরে পুলিশের হাতে আটক হন। কাসেম প্লটের ভেতরে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে সেখানে একটি চৌকি রেখে রাতে অবস্থান করতেন। মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্লটটির টিনের গেট বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানো। গেট খুলে ভেতরে ঢুকলে টিনশেড ঘরের মধ্যে একটি কাঠের চৌকি উল্টানো অবস্থায় পড়ে আছে। আগে সেখানে রিকশার গ্যারেজ থাকায় জায়গাটি সমান করতে বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিদ্যুতের সংযোগও নেই। প্লটের একপাশে চালাবিহীন পুরোনো দুটি ইটের ঘর এবং মাঝখানে মাটি ও ইট-পাথরের ঢিবি দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন বলেন, ‘কাসেম তাদের আশ্রয় দিত। এতগুলা পোলা ভেতরে ঢুকলে আর সে কিছুই জানে না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।’ পরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাসেম প্রায় ৩৫ বছর ধরে এলাকায় বসবাস করছেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। যে প্লটের কেয়ারটেকার তিনি, তার বিপরীত পাশে একটি রিকশার গ্যারেজ রয়েছে, যার মালিক তার ভাই। তবে ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তার স্ত্রী এলাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন।
অন্যদিকে, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ ধরতে যতটুকু প্রয়োজন বল প্রয়োগ করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, চেষ্টা থাকবে ন্যূনতম বল প্রয়োগ করার জন্য। যেখানে পুলিশ আক্রান্ত হবে, যেখানে অস্ত্র ব্যবহার হবে, সেখানে অবশ্যই আমাদের আত্মরক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গত মঙ্গলবার ঢাকা উদ্যান এলাকায় অভিযানে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের ওপর চাপাতি দিয়ে আক্রমণের ঘটনায় রাতে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি বলেন, যখন তারা অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছে, সে সময় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা ছাড়া উপায় ছিল না।

