নির্বাচনে ‘ষড়যন্ত্র’ করে ১১-দলীয় ঐক্যকে হারানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলের নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দল সেদিন রিভোল্ট (বিদ্রোহ) করলে বা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে, এর শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা কেউ জানে না। তাই ১১ দল দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। সেমিনারের শিরোনামÑ ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আমাদের দায়বদ্ধতা’। আয়োজক ১১-দলীয় ঐক্য।
শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনে ষড়যন্ত্র করে জামায়াতসহ ১১ দলকে হারানো হয়েছে। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিচয় ছিল নিরপেক্ষ ও দলনিরপেক্ষ। কিন্তু তারাও এই ষড়যন্ত্রে শরিক ছিল। পরে বিষয়টি স্বীকারও করা হয়েছে।
বিএনপি নিজেদের দেওয়া কথা না রেখে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘আমরা বিস্মিত হলাম, জাতীয় সংসদের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতারণার আত্মস্বীকৃত সাক্ষী পাওয়া যায়। লজ্জা সামান্য, হায়া-শরম থাকলে এটা হওয়ার কথা ছিল না। ভালো হয়েছে জাতি চিনে ফেলছে, এখন আর অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। ওখানে যা বলা হয়, কার্যত তা লেখা হয়ে যায়, ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, যদি এটা এক্সপাঞ্জ না হয়ে থাকে। যেহেতু এই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হয়নি, কাজেই এই আত্মস্বীকৃতিও রেকর্ড হয়ে থাকল। শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘জুলাই চার্টার’ একটা অন্তহীন প্রতারণার দলিল। আর এই সংসদে দাঁড়িয়েই আবার প্রমাণ করল, তারাই জাতির সঙ্গে অন্তহীন প্রতারণা করেছে। তারা বলে, ‘এই চারটা (গণভোটের) প্রশ্ন আমিই বুঝি না, সাধারণ জনগণ বোঝে কীভাবে?’ তাঁর প্রশ্ন হলোÑ ৪টি প্রশ্ন যদি জনগণ না বোঝে, তাহলে ৩১টি (বিএনপির ৩১ দফা) বোঝে কীভাবে? জামায়াতের আমির বলেন, ‘৪টা তো ছোট ৩১টির চেয়ে। তাহলে ৩১টা বুঝে নাই জনগণ। সুতরাং জনগণকে আপনারা মূর্খ বলছেন...আমরা এখানেও নিন্দা জানাই।’ রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের সুবিধামতো অবস্থান পরিবর্তন করে, তাহলে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে বলে মন্তব্য করেন বিরোধী দলের নেতা।
‘সরকারের জন্য এক ঝাঁকুনিই যথেষ্ট’; গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন হবে বলে জানান বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তারা সংসদের ভেতরে চিৎকার দেবেন। রাজপথে সমানতালে তাদের আন্দোলন চলছে, আরও বেগবান হবে। দিনের পর দিন ঝড়বৃষ্টি সব কিছু উপেক্ষা করে এ পর্যন্ত আন্দোলন বাস্তবায়ন হয়েছে। লোহা গরম হয়ে লাল হতে একটু সময় লাগে। কিন্তু লাল যখন হবে, তখন জনগণ হাতে মুগুর নিয়ে ঠিকমতোই পেটাবে। বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন একসাথে মজলুম ছিলাম। আন্দোলন করেছি, সংগ্রাম করেছি। নির্বাচন করেছি, সরকার পরিচালনা করেছি, রাজনীতি করেছি। কিন্তু এখন আমাদের কোনো কোনো বন্ধুর ভাষা ও বক্তব্যে মনে হয়, তারা জীবনে আমাদেরকে কোনো দিন দেখেন নাই। ভুলে গেছেন এত তাড়াতাড়ি? স্মরণ হতে সময় লাগবে না, একটা ঝাঁকুনিই যথেষ্ট।’
‘নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ মেনে নেব না; নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ মেনে নেবেন না বলে জানান জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নতুন হোক বা পুরোনো, কোনো ফ্যাসিবাদ তারা মেনে নেবেন না। এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট। জেল-জুলুমের ভয় তাদের যেন দেখানো না হয়। দেশের জন্য, জাতির জন্য সর্বোচ্চ পরিণতি ভোগ করতে তারা প্রস্তুত আছেন। লড়াই চলবে। বিজয় জনগণের হবে। তার আগ পর্যন্ত লড়াই থামবে না। গণভোটের রায় নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তারা এই বার্তাটিই দিতে চান যে জাতির রায়ের অপমান সহ্য করবেন না। জাতির রায়কে সম্মানিত করার জন্য তাঁদের লড়াই চলছে। তাঁরা জাতিকে সঙ্গে নিয়েই বিজয়ী হবেন। বাংলাদেশের জন্য বিজয়ী হবেন। জুলাই যোদ্ধাদের অপমান করার দুঃসাহস কেউ যাতে না দেখায়, সে ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে, আপনারা সংযত হন। সংযত না হলে জনগণের উত্তাল ঢেউ আর জোয়ারে সব জঞ্জাল ভেসে যাবে। আইন আমরা হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে নই। কিন্তু আমরা তা-ও বলব যে কেউ শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে জুলাইকে অপমান করার দুঃসাহস আর দেখাবেন না। যদি দেখান, মনে রাখবেন, এই যুবসমাজ, এই জনতা এখনো ঘুমিয়ে যায়নি।’
অনুষ্ঠানে, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বিরুদ্ধে নানা কৌশলে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কেউ চিত্রনায়িকা, কেউ মডেল, আবার কেউ সিনিয়র সাংবাদিকের পরিচয়ে টক শোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, যা জুলাইয়ের বিপক্ষে জনমত তৈরির প্রচেষ্টা। সরকারের কাছে অতিদ্রুত গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বাস্তবায়ন করার দাবি জানিয়ে আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আর রক্তপাত দেখতে চায় না। তারা একটা গণতান্ত্রিক উপায়ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাক্সিক্ষত সংস্কার, রূপান্তর দেখতে চায়।
আখতার হোসেন বলেন, সরকারদলীয় নেতারা সংসদে দাবি করেছেন, গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে সাড়ে তিনটি তারা মেনে নিয়েছেন, বাকি আধাটি মানেননি। তবে জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার চারটি প্রশ্নের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। তাই জনগণের রায়ের বাইরে গিয়ে কোনো অংশ বাস্তবায়ন না করার সুযোগ নেই।
সেমিনার সঞ্চালনায় ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। প্রবন্ধ পাঠ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকউটর তাজুল ইসলাম। আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। সভাপতির বক্তব্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘১১ দল আপনার শত্রু নয়। আমরা আপনার ও দেশের কল্যাণ চাই। আপনার চারদিক শত্রু দ্বারা বেষ্টিত। আপনি ঢাকার বাইরে রাতযাপন করবেন না। আর দেশের মঙ্গল ও আপনার কল্যাণের জন্য সংস্কারের বিষয়গুলো মেনে নিন।’

