বাংলাদেশ সময় আজ রোববার সকাল ৭টায় যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফুটবল বিশ^কাপের মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচকে সামনে রেখে কানসাসের চড়া রোদে মাঠের এক কোণে ফুটবল ছেড়ে টেনিস বল নিয়ে প্র্যাকটিস করেছেন সুইজারল্যান্ডের তিন গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল, ইভন এমভোগো ও মারভিন কেলার। প্র্যাকটিসে ফুটবল ছেড়ে টেনিস বলÑ অভিনব এই প্রস্তুতি চমকে দেওয়ার মতো হলেও সামনে যখন লিওনেল মেসি আর বিশ^চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, তখন কোনো কিছুই বাদ থাকছে না। ১৯৫৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে সুইসরা। তাই কোনোভাবেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না সুইসরা।
অন্যদিকে কোচ লিওনেল স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে জিতেছিল বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি। এবার স্কালোনি দাঁড়িয়ে আরেক ইতিহাসের সামনে। ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি আর্জেন্টিনার সামনে। তবে স্কালোনির ভাবনায় কেবল ট্রফি নয়, তিনি খুঁজছেন এক চিরন্তন উত্তরাধিকার। এই মহারণের আগে গতকাল অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়ে স্কালোনি জানালেন তার মনের গভীরের এক ইচ্ছা। তার দলকে ট্রফি জয়ী হিসেবে তো বটেই, তার চেয়েও বড় ‘হার না মানা’ এক দল হিসেবে মনে রাখুক ফুটবল বিশ্ব।
হাইভোল্টেজ এই নকআউট ম্যাচকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই মহালড়াইয়ের সম্ভাব্য ফল নিয়ে চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দিয়েছে বিখ্যাত ক্রীড়া পরিসংখ্যান সংস্থা অপ্টার সুপার কম্পিউটার।
অপ্টার শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের ২৫ হাজার ম্যাচ-সিমুলেশনের গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাঠের লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় আর্জেন্টিনার সরাসরি জয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে ৫৭.১ শতাংশ। বিপরীতে আল্পস পর্বতের দেশ সুইজারল্যান্ডের নির্ধারিত সময়ে জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১৮.৭ শতাংশ। তবে ২৪.২ শতাংশ ক্ষেত্রে ম্যাচটি নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ড্র হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে; যার অর্থ দাঁড়ায়, সেমিফাইনালের টিকিট নির্ধারণের জন্য খেলা গড়াতে পারে অতিরিক্ত সময় কিংবা রোমাঞ্চকর টাইব্রেকারে।
অবশ্য চলতি বিশ্বকাপে বারবার চেনা হিসাব-নিকাশ আর পরিসংখ্যান উল্টে দিয়ে পথ চলার এক অদ্ভুত রেকর্ড গড়েছে আর্জেন্টিনা। তবে নির্ধারিত সময়ের মারপ্যাঁচ বাদেও টাইব্রেকার বা অতিরিক্ত সময়সহ শেষ চারে পা রাখার রেসে অলবিসেলেস্তেরা স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আর্জেন্টিনার সেমিতে যাওয়ার সামগ্রিক সম্ভাবনা ৬৯.৪ শতাংশ।
এদিকে ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশ কয়েকটি কারণে এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা বেশি। প্রথমত, নকআউটের দুটি ম্যাচ আর্জেন্টিনাকে বড় শিক্ষা দিয়েছে। এই শিক্ষা মানসিকভাবে এগিয়ে রাখবে তাদের। সুইজারল্যান্ড ম্যাচটিকে টাইব্রেকার পর্যন্ত টেনে নিতে ‘লো ব্লকে’ খেলতে চাইবে। কিন্তু প্রতিপক্ষের লো ব্লক ভাঙতে কার্যকর ট্যাকটিকস ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আছে আর্জেন্টিনার। এ ছাড়া আর্জেন্টিনার অফেন্স তো অবশ্যই ডিফেন্সও সুযোগ বুঝে গোল করতে পারে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ও চলতি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা জোহান মানজাম্বিকে ছাড়াই মাঠে নামতে হচ্ছে সুইসদের। হাঁটুর চোট থেকে সেরে না ওঠায় জোহান মানজাম্বি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন সুইসদের প্রধান কোচ মুরাত ইয়াকিন। এ ছাড়া এ পর্যন্ত হওয়া খেলায় সুইজারল্যান্ডের আক্রমণভাগের ব্যর্থতা চোখে পড়েছে। ফিনিশিং দুর্বলতাও আছে দলটির। মাঝমাঠে গ্রানিত জাকা প্রতিআক্রমণ শুরু করলেও ওপরে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় না থাকায় তা কার্যকর হয় না। অন্যদিকে সুইসদের রক্ষণেও ভারসাম্যের অভাব রয়েছে।
ইতিহাস ও কম্পিউিটার বিশ্লেষণে যাই বলুক, সেমিফাইনালের টিকিট কাটার লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ড যে কঠিন পরীক্ষা নেবে, তা ভালো করেই জানেন স্কালোনি। অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সুইজারল্যান্ডকে সমীহ করে স্কালোনি বলেছেন, ‘বিশ্বকাপে ওদের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও দারুণ অভিজ্ঞ সব খেলোয়াড় আছে ওদের দলে। তাই ম্যাচটা যে ভীষণ কঠিন হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওরা কলম্বিয়াকে হারিয়ে এসেছে, যারা এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলছিল।’ তবে সুইজারল্যান্ড যাই হোক, নিজেদের ওপরই আস্থা রাখছেন স্কালোনি। গত শুক্রকার আর্জেন্টিনার এক ১০ বছরের খুদে ভক্তের আবেগঘন বার্তার ভিডিও’র প্রসঙ্গ টেনে আর্জেন্টাইন কোচ বলেছেন, ‘আমি চাই এই জাতীয় দলটাকে সবাই এমন একটা দল হিসেবে মনে রাখুক, যারা কখনো হাল ছাড়ে না। আমরা কোচিং স্টাফ, খেলোয়াড়েরাÑ সবাই এই ভালোবাসার জন্যই ফুটবল খেলি। আমরা শুধু একটা জয়ের জন্য খেলি না। যখন হৃদয় থেকে আসা এমন আবেগ দেখি, সেটা সত্যিই অসাধারণ।’ স্কালোনি মনে করেন, ট্রফির চেয়েও এই নিরেট আবেগ আর হার না মানার মানসিকতাই তার দলের আসল উত্তরাধিকার। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ও মেসির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সুইস কোচ বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনা অজেয় নয়’।

