ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেল সাদেকের স্বপ্ন

রাজস্থলী (রাঙামাটি) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নদী, ছড়া ও খাল উপচে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন খামারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উপজেলার ৩ নম্বর বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের ডাকবাংলাপাড়া এলাকার তরুণ খামারি মোহাম্মদ সাদেক। বন্যার পানিতে তার পোলট্রি খামারের প্রায় দেড় হাজার ব্রয়লার মুরগি মারা গেছে। এতে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার সরেজমিনে ডাকবাংলাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানি নেমে গেলেও খামারজুড়ে ধ্বংসের চিহ্ন রয়ে গেছে। মেঝেতে জমে আছে কাদা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মৃত মুরগির পালক। কয়েক দিন আগেও যে খামারে হাজারো মুরগির শব্দে মুখরতা ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। নিজের ক্ষতির হিসাব কষে হতাশ হয়ে পড়েছেন খামারি সাদেক।

খামার সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে ঋণ ও নিজস্ব অর্থ ব্যয় করে খামারটি গড়ে তোলেন তিনি। সেখানে প্রায় দেড় হাজার ব্রয়লার মুরগি পালন করা হচ্ছিল। প্রতিটি মুরগির গড় ওজন ছিল প্রায় ১ কেজি ২০০ গ্রাম। কয়েক দিনের মধ্যেই এসব মুরগি বাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এর আগেই টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আকস্মিকভাবে খামারে পানি ঢুকে পড়ে।

খামার মালিক জানান, পানি এত দ্রুত বেড়ে যায় যে মুরগিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ পাননি তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো খামার পানিতে তলিয়ে যায় এবং একে একে সব মুরগি মারা যায়।

মোহাম্মদ সাদেক বলেন, ‘এই খামারই ছিল আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। ব্যাংক ঋণ, ধারদেনা ও নিজের জমানো টাকা দিয়ে অনেক কষ্টে খামারটি গড়ে তুলেছিলাম। মুরগিগুলো বিক্রির জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্যার পানি সব শেষ করে দিল। প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন ঋণ পরিশোধ ও পরিবার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব হারিয়ে আমি এখন অসহায়। সরকার ও বিত্তবানেরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে হয়তো আবার নতুন করে খামার শুরু করতে পারব।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢলে এলাকার খাল ও ছড়াগুলো পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। পরে বন্যার পানি নি¤œাঞ্চলে প্রবেশ করে। এতে অনেক বসতবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও পোলট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ডাকবাংলাপাড়ার বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন আকস্মিক বন্যা খুব কম দেখা গেছে। পানি এত দ্রুত বেড়ে যায় যে অনেকে ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সরিয়ে নিতে পারেননি। এলাকার অন্যতম বড় ব্রয়লার খামারটি ধ্বংস হওয়ায় স্থানীয়রাও মর্মাহত।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কৃষক ও খামারিদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে সরকারি সহায়তা পান, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে চলমান বন্যায় রাজস্থলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন খামারিরা।

স্থানীয়দের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত সরকারি আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে সাদেকের মতো ক্ষুদ্র খামারিরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।