ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

সাহাবুদ্দিনের নতুন ঠিকানা গুলশানের ‘গ্রিন ভিলা’

ইকবাল হাসান ফরিদ
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৫:৫৬ এএম

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজনৈতিক অঙ্গনের এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বঙ্গভবন ছাড়ার পর কোথায় থাকবেন তিনি। সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে কী ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গভবন ছাড়ার পর রাজধানীর গুলশানের ১২৩ নম্বর রোডে নিজের আবাসিক ভবন ‘গ্রিন ভিলা’তেই উঠবেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার বিকেলে সেখানে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলতে দেখা গেছে।

শুক্রবার বিকেলে গুলশান-১-এর ১২৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িটি (গ্রিন ভিলা) ও আশপাশ এলাকায় ছিল তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ। তবে ভবনের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। সূত্র জানিয়েছে, ভবনটির পঞ্চম তলায় উঠবেন সাবেক রাষ্ট্রপতি। বঙ্গভবনের একটি সূত্রও বিষয়টি রূপালী বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে।

গুলশানের ওই ভবনটির নিরাপত্তা প্রহরী মো. মাছুম জানান, তিন থেকে চার দিন আগে মো. সাহাবুদ্দিন শতাধিক সদস্যের বহর নিয়ে বাসাটি পরিদর্শনে আসেন। বেলা পৌনে ১২টার দিকে এসে রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। ইতিমধ্যে বাসার প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ কাজ শেষ হয়েছে। শুক্রবার স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) কয়েকজন সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

এদিকে শুক্রবার সরকারি প্রটোকলের অংশ হিসেবে এদিন বাসাটিতে নতুন টেলিফোন সংযোগ দিতে যান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) দুই কর্মী। বিটিসিএলের টিসিএম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সরকারি নির্দেশে নতুন টেলিফোন লাইন সংযোগ দিতে এসেছি। আজ (শুক্রবার) সরকারি ছুটির দিন হলেও বলা হয়েছে, তিনি পদত্যাগ করায় বঙ্গভবন ছাড়ার পর এই বাসাতেই উঠবেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আগের লাইনটি বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তাই নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন, ২০১৬’ অনুযায়ী দায়িত্ব শেষে পদত্যাগ করা বা মেয়াদ পূর্ণ করা রাষ্ট্রপতিরা আমৃত্যু নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, সাবেক রাষ্ট্রপতি সর্বশেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক অবসরভাতা পাবেন। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মূল বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হওয়ায় মাসিক অবসরভাতার পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০ হাজার টাকা। তবে মাসিক পেনশনের পরিবর্তে চাইলে এককালীন আনুতোষিকও নিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হিসেবে যত বছর দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রতিবছরের জন্য এক বছরের অবসরভাতার সমপরিমাণ অর্থ এককালীন পাওয়ার বিধান রয়েছে। অবসরভাতা গ্রহণকালীন কোনো সাবেক রাষ্ট্রপতি মারা গেলে তার স্ত্রী বা স্বামী প্রাপ্য অবসরভাতার দুই-তৃতীয়াংশ হারে আমৃত্যু পারিবারিক ভাতা পাবেন। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, অবসরভাতার পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতিরা আরও কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পান। এর মধ্যে রয়েছে একজন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) ও একজন অ্যাটেনডেন্ট, দায়িত্বরত একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমপরিমাণ সরকারি চিকিৎসা সুবিধা, সরকারি খরচে আবাসিক টেলিফোন সংযোগ, দেশের অভ্যন্তরে সরকারি সার্কিট হাউস ও রেস্ট হাউসে বিনা মূল্যে অবস্থানের সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া সরকারি কূটনৈতিক (ডিপ্লোম্যাটিক) পাসপোর্ট ব্যবহারের অধিকার বহাল থাকে। তবে আইনের এসব সুবিধা সব সাবেক রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুসারে অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) মাধ্যমে পদচ্যুত রাষ্ট্রপতি এসব সুবিধা পাবেন না। একইভাবে উচ্চ আদালত কর্তৃক অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তি কিংবা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালতের রায়ে দ-িত কোনো সাবেক রাষ্ট্রপতিও এই আইনের আওতায় কোনো সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকারী হবেন না। তবে আইনের ৬ ধারায় উল্লিখিত বিষয়ের মধ্যে কোনো অভিযোগেই মো. সাহাবুদ্দিন অভিযুক্ত নন। যে কারণে তিনি উল্লিখিত সব সুবিধাই পাবেন।

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর রাষ্ট্রপতির অপসারণ বা পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হলেও তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন। আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার এবং সর্বশেষ বিএনপি সরকারের সময়েও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। অবশেষে শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে স্পিকার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।