ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

যৌন হয়রানি ও গোপনে ভিডিও ধারণ 

আন্দোলনে উত্তাল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

খুলনা ব্যুরো
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৫:৫৯ এএম

যৌন হয়রানি ও ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং ক্যানটিন কর্মীর বিরুদ্ধে ভিডিও ধারণের অভিযোগে দ্রুত বিচার ও শাস্তির দাবিতে প্রশাসনিক এবং অ্যাকাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ’২৪ হলের গণরুম-সংলগ্ন ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে মোবাইল ফোনে এক ছাত্রীর ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে ওই ছাত্রী সহপাঠীদের জানালে হলের বিভিন্ন ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। খবর পেয়ে নিরাপত্তাকর্মীরা হলের ক্যানটিনে কর্মরত ইমাম হাসানকে আটক করেন। পরে শিক্ষার্থীরা তাকে মারধর করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ইমাম হাসানকে আটকের পর তার স্ত্রী রুপা মণি ঘটনাস্থলে গিয়ে মারমুখী আচরণ করেন এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। পরে তাকেও আটক করা হয়। হল প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং পুলিশকে খবর দেয়।

ঘটনার প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জন করেন এবং ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেন। একই সঙ্গে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং ক্যানটিন কর্মীর বিরুদ্ধে ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিচার না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিলে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক হলেও দাবিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের আশ্বাস না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ওইদিন রাতে প্রশাসনিক ভবনের পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক ভবনেও নতুন করে তালা দেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক মো. নুরুন্নবী জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম, বিভিন্ন স্কুলের ডিন, রেজিস্ট্রার, ডিসিপ্লিন প্রধান, আবাসিক হলের প্রভোস্ট, ছাত্রবিষয়ক পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একাধিক জরুরি বৈঠক হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বিজয় ’২৪ হলের ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যানটিন কর্মী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্টকে জবাবদিহির আওতায় আনা, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার ও অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে দ্রুত স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা এবং সম্প্রতি গঠিত ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের গঠনপ্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে প্রশাসন আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দাবি মেনে নেয়নি। এতে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে কার্যকর পদক্ষেপের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে গত ১৮ জুন অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানো ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর তাকে ডিসিপ্লিন প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের সাত সদস্যের কমিটি অভিযোগটি তদন্ত করছে।

অন্যদিকে, গত বছর আগস্টে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে দুই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। তদন্ত শেষে গত ২৮ ডিসেম্বর সিন্ডিকেট একটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দিলেও অন্য অভিযোগে তাকে দুই বছরের জন্য পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণসহ সবধরনের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অভিযুক্ত ক্যানটিন কর্মী ইমাম হাসান ও তার স্ত্রী রুপা মণির বিরুদ্ধে হরিণটানা থানায় মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচালিত ক্যানটিনের বরাদ্দ বাতিল, হলের ভেতরে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ, অপরাজিতা ও বিজয় ’২৪ ছাত্রী হলে পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়া এবং ক্যানটিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে রিভিউ আবেদন পেলে পুনঃতদন্ত করা হবে। এ ছাড়া সাময়িক বরখাস্ত অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান দুটি তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি টার্মের নিবন্ধনের সময়সীমা ৪ আগস্ট পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া এবং ১১ আগস্ট পর্যন্ত জরিমানাসহ বাড়ানো হয়েছে।

মামলার বিষয়ে ট্রেজারার অধ্যাপক মো. নুরুন্নবী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার ক্যানটিন কর্মী ইমাম হাসান ও তার স্ত্রী রুপা মণির বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে হরিণটানা থানায় মামলা করেছেন। মামলার পর আদালত ইমাম হাসানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।