রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন এমন গুঞ্জন চলছিল গত কয়েক দিন ধরেই। সেটি গতকাল শুক্রবার বাস্তব রূপ পেল। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে বিরোধী দলগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ পতনের পর দীর্ঘ অপেক্ষা কাটিয়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে স্বস্তি মিলিছে। এমনটিই প্রত্যাশিত ছিল মন্তব্য করে স্বাগত জানিয়েছে বিরোধী দল।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেরিতে হলেও জাতির ওপর থেকে স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল সন্ধ্যায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অভিনন্দন জানাই।’ একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে নিরপেক্ষতা, সততা ও সংবিধানসম্মতভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম দাবি ছিল, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রাষ্ট্রপতির পদে থাকবেন না। তিনি একসময় স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে সেই বক্তব্য অস্বীকার করে মিথ্যাচার করেছেন, যা রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেওয়া শপথের লঙ্ঘন। দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ছায়া সরে গেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এ দায়িত্ব পালনে জামায়াতে ইসলামী তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। আমরা চাই, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি এমন কেউ হোন, যিনি কোনো তোষামোদকারী নন।’
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় দলটির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এ দাবি জানান দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আমরা দেখেছি, তিনি তার যে পদত্যাগপত্র, সেখানে যে ন্যারেটিভ টেনেছেন, সেগুলো আসলে অপ্রাসঙ্গিক। অসুস্থতার কথা বললেও তার পদত্যাগপত্রের মধ্যে এমনভাবে তিনি ন্যারেটিভ সাজিয়েছেন, যেটা আসলে তার জন্য একটা সেইফ এক্সিটের জায়গা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে সেইফ এক্সিট দেওয়ার কোনো মানেই নেই। তিনি যত অপরাধ করেছেন, তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাহাবুদ্দিন চুপ্পু একজন ফ্যাসিবাদের দোসর, একজন ফ্যাসিস্ট। সে যদি বিচারের আওতায় না আসে, তাহলে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের বিচার অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে।’
সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এত দিন পর্যন্ত হয়তো এই সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রাষ্ট্রপতি পদে আসীন থাকার কারণে তার ব্যাপারে আইনগত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করামাত্র তার ব্যাপারে আইনগত ইনডেমনিটির কোনো জায়গা নেই। তার দায়মুক্তির আর কোনো বিধান নেই। এই অবস্থায় অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সরকারকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে।’
চুপ্পুকে সেইফ এক্সিট দিলে রাজপথে নামবে এনসিপি বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘চুপ্পুকে আরও আগেই পদত্যাগ করানো উচিত ছিল। ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।’
এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, অবশেষে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পদত্যাগ করলেন। ফ্যাসিবাদের পতনের পরেই তার পদত্যাগ প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু রাজনীতির নানা আন্তঃস্রোতের কারণে এত দিন তিনি বঙ্গভবনে অস্বস্তির কারণ হয়ে টিকে ছিলেন। তার পদত্যাগকে স্বাগত জানাই।
উল্লেখ্য, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি, যিনি সময়ের ব্যবধানে তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন।

