রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এই উদ্যানের বুকে সম্প্রতি গড়ে উঠেছিল এক বিতর্কিত অবৈধ স্থাপনা। বাঁশ, টিন, ত্রিপল, কাঠ আর পরিত্যক্ত বোতল দিয়ে তৈরি সেই আস্তানার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নবাবপাড়া’।
সেখানে নামাজের স্থান তৈরি করে মসজিদে রূপ দিতে নেওয়া হচ্ছিল গণস্বাক্ষর। এই নবাবপাড়ার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন রাজিব শাহ নামের এক ব্যক্তি। রোববার (২৬ জুলাই) রাজিব শাহের এই আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নানা অভিযোগ উঠলেও তিনি এখনো রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাশাপাশি তার (রাজীব শাহ) আসল পরিচয় নিয়ে এখনো রয়েছে ধোঁয়াশা। তবে পুলিশ বলছে, তাকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাধারণ টোকাই পরিচয়ের আড়ালে রাজীব শাহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গড়ে তুলেছিলেন একটি সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন বেশ কিছুদিন ধরে। মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থ সংগ্রহ করে হাতিয়ে নেওয়া। দিনে ধর্মীয় নানা বিধি অনুসরণ করা হলেও রাতে পাল্টে যেত এই আস্তানার রূপ। রাতভর সেখানে চলত মাদক বিক্রি ও সেবনের আসর। মোহাম্মদপুরের মাদকপল্লি জেনেভা ক্যাম্পের চুয়া সেলিমের আস্তানা থেকে এখানে আনা হতো ইয়াবা ও গাঁজা। সেই মাদক রাতের আঁধারে বিক্রি করতেন এই আস্তানায় বসে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ও নিয়মিত দর্শনার্থীসহ সাতজনের সঙ্গে কথা হয় রূপালী বাংলাদেশের। তাদের ভাষ্য, দিনের বেলায় কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা হলেও রাত নামলেই বদলে যেত পুরো দৃশ্য। কথিত মসজিদের পাশের খুপরিগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত বসত গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের আসর। মাদকসেবী ও কারবারিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল পুরো এলাকা।
একজন নিয়মিত দর্শনার্থী বলেন, ধর্মের নাম ব্যবহার করে এখানে অন্য ধরনের কর্মকাণ্ড চলছিল। দিনে যা দেখা যেত, রাতে দৃশ্যটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রোববার আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর রাজীব শাহ আত্মগোপনে চলে গেছেন, যে কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর আগে রাজীব শাহ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, তিনি নিজের ঠিকানা ও বাবা-মায়ের পরিচয় জানেন না। তার দাবি, তিনি পালিত বাবা-মায়ের কাছে বেড়ে উঠেছেন। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসবাস করছেন। পালিত বাবা-মায়ের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা পেয়েছেন। তিনি বলেন, পারিবারিক শিক্ষা থেকেই তিনি এখানে এসব কার্যকলাপ চলমান রাখেন।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ১০ বছর নয়, ৮-৯ মাস আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে বসবাস শুরু করেন রাজীব শাহ। তিনি দিনে বোতল কুড়াতেন। প্রথম দিকে তিনি এম্পিথিয়েটারের পাশে একটি ছোট খুপরি ঘর ও ফুলের বাগান তৈরি করেন। পরে সেই স্থাপনাই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। গত মে মাসের প্রথম দিকে সেখানে ত্রিপল টাঙিয়ে, কার্পেট বিছিয়ে, অজুর ব্যবস্থা করে গড়ে তোলা হয় একটি অস্থায়ী মসজিদ। শুক্রবার সেখানে জুমার নামাজও আদায় করা হতো। এ ছাড়া মসজিদ তৈরির জন্য নেওয়া হচ্ছিল গণস্বাক্ষর। শুধু তাই নয়, আশপাশে ধানখেতের আদল তৈরি করে সেটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের উপযোগী একটি স্থানে পরিণত করা হয়। রাজু আহমেদ নামে এক যুবক জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চারপাশেই একাধিক স্থায়ী মসজিদ রয়েছে। এর পরও উদ্যানের ভেতরে অনুমতি ছাড়া নতুন করে একটি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজিব একা নন, তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কয়েকজন ভুঁইফোড় ইউটিউবার ও টিকটকার। তারা পুরো ঘটনাকে ভিডিও কনটেন্টে রূপ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। অভিযোগ রয়েছে, মসজিদ নির্মাণ, দানবাক্স ও উন্নয়নকাজের কথা বলে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করা হতো। পাশাপাশি মসজিদ নির্মাণে ব্যবহৃত কিছু ইট ও নির্মাণসামগ্রী আশপাশের উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা বিভিন্ন স্থান থেকে এনে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ওঠার পর অবশেষে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়। গত বৃহস্পতিবার উদ্যানে নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি কিছু বহিরাগত অসাধু ভবঘুরে ও একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মন্দিরের গেট বরাবর কিছু অবৈধ দোকানপাট বসিয়েছে। উদ্যানের এম্পিথিয়েটার-সংলগ্ন কিছু স্থানজুড়ে অস্থায়ী নামাজের স্থান নির্মাণের নামে উদ্যানের জায়গা দখল করে দিনরাত অবস্থান করছেন। প্রকল্পের আওতাধীন একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ উদ্যানে রয়েছে। এর পরও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে বহিরাগতরা এই অস্থায়ী নামাজের স্থান নির্মাণ করে নিয়মিত অবস্থান করছেন। তাদের বারবার ওই স্থান ছাড়তে বললেও তারা হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।
গণপূর্ত উপবিভাগের কর্মচারী ও আনসার বাহিনীর সঙ্গে তারা রূঢ় আচরণ করছেন। এসব অবৈধ স্থাপনা সরাতে এই নোটিশে ৭২ ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়। কিন্তু আল্টিমেটামের মধ্যে এসব স্থাপনা না সরানোয় রোববার দুুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় আলোচিত নবাবপাড়া নামের এই অবৈধ স্থাপনা। অভিযানকালে মসজিদের আদলে গড়া নামাজের স্থান থেকে কয়েকটি কোরআন শরিফ ও ধর্মীয় বই উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি পুরো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের বিভিন্ন আলামতও পাওয়া যায়।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রোববার অভিযান চালিয়ে এই অবৈধ আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ সময় রাজীব শাহকে পাওয়া যায়নি। তাকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। ওসি জানান, রাজীব শাহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে তার যাতায়াত ছিল।
ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে যেসব অবৈধ স্থাপনা ছিল, সব উচ্ছেদ করা হয়েছে। নামাজের জায়গা বলে আলাদা কোনো বিষয় নেই।
এদিকে সচেতন মহলের প্রশ্ন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনার ভেতরে এত বড় অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলেও দীর্ঘদিন তা কীভাবে প্রশাসনের নজরের বাইরে ছিল? তাদের মতে, শুধু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। এর পেছনে কোনো সংগঠিত চক্র বা অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল কি না- এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

