মাত্র দেড় মাস আগে নতুন সংসার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীতে এসেছিলেন কুমিল্লার দেবিদ্বারের ফাহিমা আক্তার। পাশে ছিলেন ভালোবেসে বিয়ে করা স্বামী আনোয়ার হোসেন শাহিন। সঙ্গে ছিল আট বছরের ভাগনি হাফসা। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা, ছোট্ট একটি ব্যবসা আর সুখের সংসার। কিন্তু গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে হওয়া এক বিস্ফোরণ মুহূর্তেই সেই স্বপ্নকে পরিণত করেছে শোকগাথায়।
কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে শনিবার (২৫ জুলাই) সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা যান ফাহিমা। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান তাঁর স্বামী শাহিন এবং শুক্রবার মৃত্যু হয় শিশু হাফসার। একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুতে দেবিদ্বারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ফাহিমা দেবিদ্বার উপজেলার গোমতী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা গোলাম হোসেনের ছোট মেয়ে। জাফরগঞ্জ মীর আব্দুল গফুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি কেক তৈরি ও পোশাক বিক্রিসহ অনলাইন ব্যবসায় নিজের অবস্থান গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন নিয়েই স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে উত্তর বাড্ডার ভাটারা এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। মায়ের স্নেহে বড় করে তোলার আশায় সঙ্গে নিয়ে যান বড় বোনের আট বছরের মেয়ে হাফসাকেও।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর দেবিদ্বারের গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাঙ্গুরী গ্রামের আনোয়ার হোসেন শাহিনের সঙ্গে ভালোবেসে বিয়ে হয় ফাহিমার। দেড় মাস আগে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় নতুন বাসায় ওঠেন তারা। গত ২১ জুলাই রাত প্রায় ৩টার দিকে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে দুটি কক্ষে।
দগ্ধ অবস্থায় ফাহিমা, শাহিন ও হাফসাকে উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ দগ্ধ হওয়া ফাহিমা কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান। এর আগেই না-ফেরার দেশে চলে যান তাঁর স্বামী ও ভাগনি।
শুক্রবার বাদ মাগরিব হাফসাকে দেবিদ্বারের সুলতানপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। শাহিনকে দাফন করা হয় বাঙ্গুরী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। রোববার সকালে দেবিদ্বার পৌর এলাকার গোমতী আবাসিক এলাকার চানমিয়া মার্কেট মাঠে ফাহিমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্বামীর পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়।
মেয়েকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাহিমার বাবা গোলাম হোসেন বলেন, বাসায় ওঠার পর থেকেই গ্যাস লিকেজের বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হয়েছিল। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হয়তো আজ আমার মেয়েটা বেঁচে থাকত। অবহেলার কারণেই আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি। আমি এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
তিনি আরও বলেন, আমার বড় মেয়ের শিশুকন্যা হাফসাও ওদের সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিল। ওদের তিনজনের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সামান্য অবহেলায় সব শেষ হয়ে গেল।
গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবু হানিফ বলেন, শাহিন-ফাহিমা দম্পতি ও শিশু হাফসার মৃত্যুতে পুরো এলাকাই শোকাহত। এমন মর্মান্তিক ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

