ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

শুরু হচ্ছে ৪৮ দলের মহাসমর

মির্জা হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৬:০৯ এএম

ফুটবল ইতিহাসের চেনা মানচিত্রটা বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে ৩২টি দলের যে চেনা কাঠামোয় ফুটবলবিশ্ব অভ্যস্ত ছিল, তা ভেঙে এবার উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূখ-ে উন্মোচিত হতে যাচ্ছে অভূতপূর্ব ও বিশালাকার দিগন্ত। ফিফা বিশ্বকাপের ২০২৬ আসর কেবল একটি নতুন টুর্নামেন্ট নয়, এটি ফুটবলীয় ভূরাজনীতি ও বিশ্বায়নের ইতিহাসে যুগান্তকারী রূপান্তর। ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ এবার পা রাখছে ৪৮ দলের এক মহাসমরে। তিনটি দেশের ভৌগোলিক সীমানায়, ১৬টি ভেন্যুর আঙিনায়, ৩৯ দিন ধরে চলবে ১০৪টি ম্যাচের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যারাথন উৎসব। সংখ্যার এই বিশালত্ব ও ইতিহাসের এই নতুন বিন্যাসকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে এবারের বিশ্বজয়ের রণকৌশল।

৩২ থেকে ৪৮

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে শুরু হওয়া ৩২ দলের চিরাচরিত রূপরেখা বিদায় নিয়েছে। দীর্ঘ আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণের পর ফিফা এবার দলসংখ্যা বাড়িয়ে করেছে ৪৮। এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু বাণিজ্যিক সমীকরণ নয়, বরং লুকিয়ে আছে ফুটবলকে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী আকাক্সক্ষা। এতদিন যেখানে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিদের আধিপত্যের মাঝে এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা ওশেনিয়া অঞ্চলের উদীয়মান দেশগুলোর জন্য সুযোগ ছিল সীমিত, এবার সেই দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে।

এই নতুন বিন্যাসে দল বাড়ছে ঠিকই, তবে তীব্রতা কমছে না। ৩টি করে দল নিয়ে গঠন করা হয়েছে ১৬টি গ্রুপ। প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল নিয়ে শুরু হবে ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর নকআউট পর্ব। অর্থাৎ, গ্রুপ পর্বের সমীকরণ এবার আরও জটিল ও রোমাঞ্চকর। দল বাড়ার কারণে ম্যাচসংখ্যা ৬৪ থেকে একলাফে উন্নীত হয়েছে ১০৪-এ। ৩৯ দিনের এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রতিটি দলকে ট্রফি ছুঁতে হলে খেলতে হবে ৮টি ম্যাচ, যা আগের সংস্করণের চেয়ে একটি বেশি। এটি কেবল ফুটবলারদের শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষাই নয়, বরং দলগুলোর বেঞ্চ স্ট্রেন্থ বা বিকল্প খেলোয়াড়দের গভীরতা প্রমাণেরও এক চূড়ান্ত মঞ্চ।

ত্রিদেশীয় মেলবন্ধন

ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে তিনটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা। এর আগে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ আয়োজক হলেও, এবারের বিস্তৃতি ও ভৌগোলিক দূরত্ব আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। উত্তর আমেরিকার এই মহাদেশীয় ক্যানভাসজুড়ে নির্বাচিত হয়েছে ১৬টি ভেন্যু। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি, মেক্সিকোর ৩টি এবং কানাডার ২টি স্টেডিয়াম এই ফুটবল মহাযজ্ঞের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।

এই ত্রিদেশীয় আয়োজনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং স্টেডিয়ামগুলোর অবকাঠামোগত শ্রেষ্ঠত্ব। আটলান্টিকের উপকূল থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের তীর, আর কানাডার বরফশীতল হাওয়া থেকে মেক্সিকোর তপ্ত রোদ; সব মিলিয়ে এই আসরটি যেন গোটা উত্তর আমেরিকাকে সুতোয় বেঁধেছে। তবে এই বিশাল ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে দলগুলোর যাতায়াত এবং ক্লান্তি দূর করাটাই হবে টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু ও ভূগোলের চ্যালেঞ্জ

এই বিশাল মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ফুটবলারদের লড়তে হবে প্রকৃতির সঙ্গেও। তিনটি ভিন্ন দেশের জলবায়ু এবং ভৌগোলিক উচ্চতা (অল্টিটিউড) দলগুলোর জন্য অদৃশ্য প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ভেন্যুর আবহাওয়ার চরম বৈপরীত্যের কথা বলা যায়Ñ

মেক্সিকো সিটি (এস্তাদিও অ্যাজটেকা) : সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই ভেন্যুর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাতলা বাতাস ও অক্সিজেনের স্বল্পতা। এখানে খেলতে নেমে ভিনদেশি খেলোয়াড়দের দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক।

মিয়ামি (হার্ড রক স্টেডিয়াম) : তীব্র দাবদাহের পাশাপাশি এখানকার চরম আর্দ্রতা (হিউমিডিটি) খেলোয়াড়দের শরীর থেকে দ্রুত পানি শুষে নেবে। ফলে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা রোধ করা এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।

ভ্যাঙ্কুভার (বিসি প্লেস) : কানাডার এই ভেন্যুতে আবহাওয়া থাকবে তুলনামূলক শীতল ও আরামদায়ক। তবে কৃত্রিম ঘাস (আর্টিফিশিয়াল টার্ফ) এবং হঠাৎ বৃষ্টির পূর্বাভাস খেলার গতি ও বলের বাউন্সে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা

এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ও সমাপনী ভেন্যুর দুটি গল্প যেন ফুটবলের অতীত ঐতিহ্য এবং বর্তমান আধুনিকতার এক অপূর্ব কোলাজ। টুর্নামেন্টের পর্দা উঠছে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও অ্যাজটেকা’ স্টেডিয়ামে। ফুটবল তীর্থ হিসেবে পরিচিত এই মাঠটি ইতিহাসের প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের (১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬) উদ্বোধনী ম্যাচের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। এই মাঠেই পেলে বিশ্বজয় করেছিলেন, আর এই মাঠেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা করেছিলেন সেই অমর ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। অ্যাজটেকার প্রতিটি ঘাসের কণা যেন ফুটবলের রোমান্টিক ইতিহাসের কথা বলে।

অ্যাজটেকায় যে রোমাঞ্চের শুরু, তার মহাকাব্যিক সমাপ্তি ঘটবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ‘মেটলাইফ স্টেডিয়ামে’। প্রায় ৮২,৫০০ আসনবিশিষ্ট এই অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামটি বৈশ্বিক বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। নিউইয়র্ক শহরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভেন্যুটি তার স্থাপত্যশৈলী, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং করপোরেট আভিজাত্যের জন্য অনন্য। ঐতিহ্যের আঙিনা থেকে যাত্রা শুরু করে ফুটবলের এই মহাবৈশ্বিক উৎসব শেষ পর্যন্ত যেখানে গিয়ে থামবে, সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল ম্যাচটিই নির্ধারণ

করবে ৪৮ দলের এই মহাযুদ্ধের শেষ সম্রাটকে। সংখ্যার এই বিশাল খতিয়ান শেষ পর্যন্ত মাঠে কতটা রোমাঞ্চ ছড়ায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।