সময় বড় নির্মম, কিন্তু ফুটবল চিরকালই রূপক এবং রোমান্টিকতার এক অপূর্ব ক্যানভাস। উত্তর আমেরিকার সবুজ গালিচায় যখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন শুরু হতে যাচ্ছে, তখন বিশ্ব ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক ও অনিবার্য সন্ধিক্ষণে। ফুটবলের আধুনিক ব্যাকরণ ও গত দুই দশকের মহাকাব্যিক আখ্যান যাদের পায়ে ভর করে আবর্তিত হয়েছে, সেই ‘ওল্ড গার্ডস’ বা পুরোনো রক্ষী দল তাদের শেষ সুরটি গাইতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, স্পর্ধিত যৌবনের জয়গান গেয়ে ফুটবলের রাজসিংহাসন দখল করতে উন্মুখ একঝাঁক তরুণ তুর্কি। এবারের বিশ্বকাপ কেবল মাঠের লড়াই নয়, এটি আসলে ফুটবল বিশ্বের রাজদ- ও ব্যাটন হস্তান্তরের এক মহাকাব্যিক ও বিশ্লেষণধর্মী দলিল। একদিকে ৩৮ বছর বয়সি লিওনেল মেসি ও ৪১ বছর বয়সি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ গোধূলির আলো, অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা জুড বেলিংহামদের মধ্যগগনের সূর্য, এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই নির্ধারিত হবে আগামীর ফুটবলীয় রাজনীতি।
মেসি-রোনালদোর গোধূলি
ফুটবল রোমান্টিকদের মনের কোণে এখন অদ্ভুত বিষাদের সুর। গত দুই দশক ধরে ফুটবলবিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রাখা গ্রহের অন্যতম সেরা দুই নক্ষত্র সম্ভবত তাদের ক্যারিয়ারের অন্তিম বৈশ্বিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে। কাতার বিশ্বকাপে নিজের আজন্ম আরাধ্য সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে লিওনেল মেসি ফুটবল রূপকথার পূর্ণতা দিয়েছিলেন। এবার ৩৮ বছর বয়সে, আমেরিকার চেনা মাঠে আলবিসেলেস্তেদের আকাশি-সাদা জার্সিতে তিনি যখন নামবেন, তখন তার ওপর কোনো বাড়তি চাপ নেই, আছে কেবল ফুটবলকে বিলিয়ে দেওয়ার পরম আনন্দ। তবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ট্রফি ধরে রাখার অদম্য তাড়না আর মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়টি আরও সোনালি করার আকাক্সক্ষা মেসির মায়াবী বাঁ-পায়ে কতটা জাদু ছড়ায়, তা দেখার জন্য উন্মুখ গোটা বিশ্ব।
অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সেও পর্তুগালের হয়ে যিনি বুক চিতিয়ে লড়ছেন, তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বয়স যার কাছে কেবলই একটি সংখ্যা, সেই সিআর সেভেন তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নামতে যাচ্ছেন, যা ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় রেকর্ড। অলিম্পাস পর্বতের চূড়া ছোঁয়া সব রেকর্ড যার ঝুলিতে, তার কেবল একটিই আক্ষেপ, বিশ্বকাপের সেই সোনালি ট্রফি। ৪১ বছরের শরীর নিয়ে ইউরোর হতাশা ভুলে রোনালদো যখন শেষবারের মতো হুঙ্কার ছাড়বেন, তখন তা হবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে লড়াকু মানসিকতার এক জীবন্ত রূপক। এই দুই মহারথী কি পারবেন আরও একবার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা ওড়াতে? ফুটবল রোমান্টিকেরা অন্তত সেই আশাতেই বুক বাঁধছেন।
ক্ষমতার রূপান্তর
ওল্ড গার্ডসরা যখন বিদায়ের বাঁশিতে সুর বাঁধছেন, তখন ফুটবল বিশ্বের ব্যাটন ও রাজদ- নিজেদের হাতে তুলে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত নব্য সাম্রাজ্যের অধিপতিরা। এই ক্ষমতার রূপান্তর বা ব্যাটন পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়নি, বরং গত কয়েক বছর ধরে ক্লাব ফুটবলের আঙিনায় এর সলতে পাকানো হচ্ছিল। এবারের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে সেই আনুষ্ঠানিক অভিষেকের মঞ্চ, যেখানে তরুণ তুর্কিরা ফুটবল বিশ্বের একচ্ছত্র আধিপত্য নিজেদের করে নিতে চাইবেন।
এই নতুন প্রজন্মের সেনাপতি নিঃসন্দেহে কিলিয়ান এমবাপ্পে। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই যার ঝুঁলিতে একটি বিশ্বকাপ ট্রফি এবং আরেকটি ফাইনালের হ্যাটট্রিক রয়েছে, তিনি এবার ফ্রান্সের অবিসংবাদিত নেতা। ফরাসি এই গতিদানবের নিখুঁত ফিনিশিং আর অবিশ্বাস্য গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমবাপ্পের সামনে সুযোগ রয়েছে পেলের মতো তরুণ বয়সেই ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের কাতারে নিজের নাম লিখিয়ে নেওয়ার।
জোগো বোনিতোর নতুন কা-ারি
লাতিন ফুটবলের যে চিরাচরিত ছন্দ আর ড্রিবলিংয়ের শৈল্পিক রূপ, তার বর্তমান প্রতীক ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। নেইমারের উত্তরসূরি হিসেবে সাম্বা ফুটবলের ঐতিহ্য এখন এই ২৫ বছর বয়সি উইঙ্গারের কাঁধে। বাঁ প্রান্ত দিয়ে ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে বল নিয়ে ভেতরে ঢোকার যে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা ভিনির রয়েছে, তা সেলেসাওদের বহু প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পেলের দেশের ফুটবলীয় অহংকার পুনরুদ্ধার করার এই মিশন ভিনিসিয়ুসের জন্য নিজেকে বিশ্বসেরা প্রমাণের চূড়ান্ত পরীক্ষা।
থ্রি লায়ন্সের মগজ
অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবলের আধুনিক কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম। মাত্র ২২ বছর বয়সেই যিনি মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা, ট্যাকল করা এবং স্ট্রাইকারের মতো গোল করার বিরল ক্ষমতার অধিকারী। থ্রি লায়ন্সদের মাঝমাঠের এই ইঞ্জিন এবার ইংল্যান্ডকে ৫৮ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বজয়ের মুকুট এনে দিতে মরিয়া। বেলিংহামের পরিপক্বতা এবং ট্যাকটিক্যাল মেধা প্রমাণ করে যে, নতুন প্রজন্ম কেবল গতিতে নয়, মগজেও বিশ্বফুটবল শাসনে প্রস্তুত।

