বিশ্বফুটবলে আর্জেন্টিনা এমন নক্ষত্র, যা নিজস্ব আলোয় যতটা ভাস্বর, তাকে ঘিরে থাকা কালো মেঘের ছায়ায় ততটাই রহস্যময়। ফুটবলের নান্দনিকতা কিংবা মাঠের ভেতরের বিশুদ্ধ আবেগ মিলিয়ে আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠ বলছে অন্য কথা।
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিভার সমান্তরালে সেখানে হেঁটেছে প্রবল বিতর্ক। আর্জেন্টিনার মহিমান্বিত বিজয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে কোনো না কোনো কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক চাল কিংবা নৈতিকতার সীমানা লঙ্ঘন। বিশ শতকের সামরিক আগ্রাসন থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও আর্জেন্টাইন ফুটবলের এই বিতর্কিত যাত্রা থামেনি। মনে হয়, বিতর্কই যেন তাদের চিরন্তন সহযাত্রী। চলুন জানা যাক এমনই কিছু বিতর্ক নিয়ে-
১৯৭৮
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বৈশ্বিক মুকুট এসেছিল ১৯৭৮ সালে, ঘরের মাঠে। কিন্তু সেই ট্রফি জয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল এর পেছনের অন্ধকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। তৎকালীন সময়ে আর্জেন্টিনা শাসিত হচ্ছিল জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা দ্বারা। সেসময় হাজার হাজার ভিন্নমতাবলম্বী নিখোঁজ হচ্ছিলেন, মানবাধিকার ক্ষুণœ হচ্ছিল প্রতিনিয়ত। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক শাসক গোষ্ঠী ফুটবলকে ব্যবহার করতে চাইল নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার হাতিয়ার বা প্রোপাগান্ডা হিসেবে। সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় কলঙ্কিত অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচে। ফাইনালে যেতে হলে আর্জেন্টিনাকে জিততে হতো অন্তত ৪-০ ব্যবধানে। রক্ষণভাগে শক্তিশালী পেরুর বিপক্ষে এমন ব্যবধানে জয় ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু অলৌকিক বা রহস্যাবৃতভাবে আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জিতে নেয় ৬-০ গোলে। অভিযোগ ওঠে, পেরুর তৎকালীন স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো বার্মুদেজের সঙ্গে টেবিল বৈঠকে বসেছিলেন ভিদেলা।
ম্যাচের আগে পেরুর গোলরক্ষক রামন কুইরোগা (যিনি জন্মসূত্রে আর্জেন্টাইন ছিলেন) এবং রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের ওপর প্রচ্ছন্ন চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ম্যাচটির পর পেরুতে বিপুল পরিমাণ গম ও আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছিল আর্জেন্টিনা সরকার, যা আজও কার্ডিনাল ডিল বা রাজনৈতিক সমঝোতার মোক্ষম প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় টিকে আছে। ১৯৭৮ সালের সেই ট্রফি তাই আনন্দের চেয়েও বেশি একনায়কতন্ত্রের রক্তিম আস্তরণে ঢাকা পড়ে গেছে।
১৯৮৬
সেবারের মেক্সিকো বিশ্বকাপ মানে স্বীকার করতে হয় ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার একক মহাকাব্য। কিন্তু সেই মহাকাব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত পাতার নাম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত তখনো দুই দেশের মানুষের মনে দগদগে। মাঠের লড়াই রূপ নিয়েছিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। ম্যাচের ৫১ মিনিটে ম্যারাডোনা ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিল্পটনের চেয়ে উচ্চতায় পিছিয়ে থেকেও লাফিয়ে উঠে বল জালে জড়ালে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম। শিল্পটনসহ সমস্ত ইংলিশ ডিফেন্ডার হ্যান্ডবলের দাবি জানালেও তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের গোলটি বহাল রাখেন।
ম্যারাডোনা পরবর্তীতে নিজেই একে আখ্যা দিয়েছিলেন লা মানো দে দিওস বা ঈশ্বরের হাত বলে। ফুটবলীয় ব্যাকরণে যা ছিল চরম অনৈতিকতা, আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের কাছে তা-ই রূপ নিয়েছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের রূপক প্রতিশোধে। একই ম্যাচে চার মিনিট পর শতাব্দীর সেরা গোলটি করে ম্যারাডোনা নিজের ফুটবল প্রতিভার চরম পরাকাষ্ঠা দেখালেও, ওই হ্যান্ড অফ গড বিতর্কটি ফুটবল ইতিহাসের চিরস্থায়ী অংশ হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে, আর্জেন্টিনার ফুটবলে জয় পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা অনেক সময় নিয়মের বেড়াজালকে অবলীলায় ভেঙে ফেলতে পারে।
১৯৯০
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফুটবল শৈলী খুব একটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না, কিন্তু মাঠের বাইরের চাতুরিতে তারা ঠিকই খবরের শিরোনাম হয়েছিল। দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। মাঠের খেলায় ব্রাজিল দারুণ চাপ সৃষ্টি করলেও ম্যাচের একপর্যায়ে অদ্ভুত কা- ঘটে। ব্রাজিলের লেফট-ব্যাক ব্রাঙ্কো অভিযোগ করেন, খেলা থামার পর আর্জেন্টিনার ফিজিওর কাছ থেকে জলপানের পর তিনি তীব্র মাথাঘোরা এবং ক্লান্তি অনুভব করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে জানা যায়, সেই জলের বোতলে মেশানো ছিল ট্রানকুইলাইজার বা চেতনানাশক ওষুধ। ফুটবলের ইতিহাসে এই ঘটনাটি হোলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে আর্জেন্টিনা এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও, ২০০৪ সালে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনা ঠাট্টাচ্ছলে স্বীকার করেন যে, ব্রাঙ্কোকে সত্যিই সেই বিশেষ বোতলের জল দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বমঞ্চে স্পোর্টসম্যানশিপ বা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবের এমন অবক্ষয় আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় চরিত্রের ডার্ক সাইড বা অন্ধকার দিকটিকেই উন্মোচিত করে।
২০২৬
অনেকেই ভেবেছিলেন ভিএআর এবং আধুনিক প্রযুক্তির যুগে হয়তো ফুটবলে বিতর্কের অবসান ঘটবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করল, বিতর্ক তাদের পিছু ছাড়ার নয়। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত এই আসরে গ্রুপ পর্ব এবং নকআউট পর্বের এক হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচটিতে আলবিসেলেস্তেরা জয়লাভ করলেও, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে জিকো বল জালে জড়ানোর পর উদযাপন শুরু করেছিল মিশর। তবে ভিএআরের পর্যালোচনার পর রেফারি গোলটি বাতিল করেন। রিভিউতে দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের কাছ থেকে বল নেওয়ার সময় তাকে ফাউল করেছিলেন। সেই ফাউলের ধারাবাহিকতায় গোলটি হওয়ায় ভিএআরের সুপারিশে গোল বাতিল করা হয়। তবে বিতর্ক তৈরি হয় ফাউল হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর, গোল হওয়ার পর ভিএআরের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাকে কেন্দ্র করে। যদিও চলতি বিশ্বকাপে সম্ভাব্য গোল বা আক্রমণের ধারাবাহিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রেফারিদের তাৎক্ষণিকভাবে খেলা না থামিয়ে পরে ভিএআরের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এ ছাড়া যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ মোহাম্মদ সালাহর কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার পর দ্রুত পাল্টা আক্রমণ গড়ে তোলে আর্জেন্টিনা। সেই আক্রমণ থেকেই এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোল করেন। মিশরের খেলোয়াড়রা দাবি করেন, বল দখলের আগে সালাহকে ফাউল করা হয়েছিল। তবে রেফারি খেলায় বাধা দেননি এবং ভিএআরের মাধ্যমে ঘটনাটি পুনরায় পর্যালোচনাও করা হয়নি। এ সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। রেফারির বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মিশরের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে, যার সুবাদে আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ম্যাচ শেষে মিশরের ফুটবল ফেডারেশন এবং আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার মতো বড় দলের বাণিজ্যিক বাজার ধরে রাখতে ফিফার অবচেতন বা সচেতন পক্ষপাতিত্ব কাজ করেছে। এই মিশর বিতর্ক প্রমাণ করে, আধুনিক যুগেও আর্জেন্টিনার জয়যাত্রা বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে না।
চিরন্তন দ্বৈরথ
ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে আবেগ এবং সমালোচনার এই দ্বৈরথ চিরন্তন। একপাশে যদি থাকে তাদের অপার্থিব পাসিং, ট্যাকটিক্যাল জিনিয়াস আর বিশ্বজয়ের উল্লাস; তবে অন্যপাশে ছায়া ফেলে যায় স্বৈরাচারের প্রোপাগান্ডা, ঈশ্বরের হাতের চাতুরী, বোতলের জল কিংবা রেফারিংয়ের আনুকূল্য। আর্জেন্টাইন ফুটবল যেন এক ট্র্যাজিক হিরো। যার প্রতিভা প্রশ্নাতীত, কিন্তু যার নিয়তি আবর্তিত হয় কোনো না কোনো নাট্যশালার গোলকধাঁধায়। বিতর্ককে এড়িয়ে নয়, বরং বিতর্ককে সঙ্গে নিয়েই তারা নিজেদের ইতিহাস লিখেছে এবং লিখছে।
আর তাই, বিশ্বফুটবলের মঞ্চে আলবিসেলেস্তেদের গল্পে মহিমা এবং কালিমা; দুই-ই সমান্তরালে হাত ধরাধরি করে চলবে, কারণ বিতর্ক যেন সত্যিই পিছু ছাড়ছে না তাদের।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন