আধুনিক ফুটবল এক অদ্ভুত ও বৈচিত্র্যময় কোলাজ। এখানে ক্লাব ফুটবলের নিবিড় সখ্য ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়। বছরজুড়ে যে খেলোয়াড়রা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন, একই ড্রেসিংরুমে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেন কিংবা একে অপরের জয়ে উল্লাসে মাতেন; বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে এসে তারাই আবার একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। দেশের জার্সির ওজন ও গ্যালারির কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশার চাপ তখন ক্লাব ফুটবলের সমস্ত আবেগ এবং সতীর্থের পরিচয়কে কিছুটা পেছনে ফেলে দেয়। মাঠের সেই ৯০ মিনিটে কেউ কাউকে এক ইঞ্চিও ছেড়ে দিতে রাজি নন। ফুটবলের এই শাশ্বত সত্যেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে চলমান ফিফা বিশ্বকাপে। যেখানে একদিকে দেখা যাচ্ছে পরম বন্ধুদের একে অপরকে ধ্বংস করার মরিয়া প্রয়াস, অন্যদিকে চলছে ক্লাব সতীর্থদের একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
হালান্ড বনাম ও’রাইলি
ক্লাব ফুটবলে তারা পেপ গার্দিওলার রণকৌশলের অন্যতম প্রধান দুই স্তম্ভ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির জার্সি গায়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড যখন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে তা-ব চালান, তখন মাঝমাঠ থেকে তার দিকে নিখুঁত পাস বাড়াতে ক্লান্তিহীন কাজ করে যান ও’রাইলি। কিন্তু বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার ও’রাইলির সামনে বড় এবং কঠিনতম দায়িত্ব হলো নিজের ক্লাব সতীর্থ হালান্ডকে আটকানো। নরওয়ের এই বিধ্বংসী স্ট্রাইকারকে থামাতে ও’রাইলির সাথে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার মার্ক গেহিও এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। যে হালান্ডের প্রতিটি মুভমেন্ট, তার গতি এবং শক্তির দুর্বলতা ও শক্তি ও’রাইলির নখদর্পণে, সেই হালান্ডকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বোতলবন্দি করাটাই এখন ইংল্যান্ড শিবিরের প্রধান লক্ষ্য। মাঠের বাইরে হয়তো ম্যাচ শেষে তারা আবার করমর্দন করবেন, কিন্তু মাঠের সবুজ গালিচায় ও’রাইলি এবং গেহির ডিফেন্সিভ ব্লকের সামনে হালান্ডের গোলক্ষুধা চরম রোমাঞ্চকর দ্বৈরথের জন্ম দিতে চলেছে।
ওডেগার্ড বনাম রাইস-সাকা
একইভাবে এমিরেটস স্টেডিয়ামের চেনা রসায়ন এবার রূপান্তরিত হতে চলেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের লড়াইয়ে। আর্সেনালকে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষে ফিরিয়ে আনার কারিগর যারা, তারা এখন একে অপরের মুখোমুখি। নরওয়ের অধিনায়ক ও মধ্যমাঠের জেনারেল মার্টিন ওডেগার্ডকে এবার লড়তে হবে তারই গানার্স সতীর্থ ডেকলান রাইস এবং বুকায়ো সাকার বিরুদ্ধে। ক্লাব ফুটবলে ওডেগার্ডের বাড়ানো থ্রু-বল ধরে সাকা যখন উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ঝড় তোলেন, তখন আর্সেনাল সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। আর রাইস মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দিয়ে ওডেগার্ডের পায়ে বল সঁপে দেন খেলা তৈরির জন্য। তবে দেশের জার্সি গায়ে চাপালেই এই সমীকরণ বদলে যায়। থ্রি লায়ন্সের মাঝমাঠ আগলানোর দায়িত্বে থাকা ডেকলান রাইসের প্রধান লক্ষ্য থাকবে ওডেগার্ডের চতুর পাসিং লাইনগুলো কেটে দেওয়া, আর সাকার গতিময় আক্রমণ রুখতে নরওয়েজিয়ান ডিফেন্সকে নেতৃত্ব দিতে হবে ওডেগার্ডকে।
এমবাপ্পে বনাম হাকিমি
মাঠে যতই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক না কেন, মাঠের বাইরে কিলিয়ান এমবাপে এবং আশরাফ হাকিমির বন্ধুত্বের গল্প আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সুন্দর অধ্যায়। ফুটবল ক্লাব পিএসজিতে একসঙ্গে খেলার সময় থেকেই এই দুই মহাতারকার মধ্যে গড়ে ওঠে নিবিড় সম্পর্ক। অনুশীলনের মাঠ থেকে শুরু করে ড্রেসিংরুম, ছুটির দিন কাটানো থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরকে নিয়ে খুনসুটি, সব জায়গাতেই ফুটে উঠত তাদের রসায়নের গভীরতা। সময়ের আবর্তনে ক্লাব বদলেছে; এমবাপে এখন রিয়াল মাদ্রিদের গ্যালাক্টিকো, আর হাকিমি এখনও পিএসজি-র রক্ষণভাগের প্রাণভোমরা। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে তারা এখন রিয়াল-বার্সার মতোই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের অংশ হলেও, ব্যক্তিগত জীবনে তাদের ২৭ বছরের অটুট বন্ধুত্বে এতটুকুও চির ধরেনি। কিন্তু যখন বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্স আর মরক্কো মুখোমুখি হয়, তখন এই গভীর বন্ধুত্বকে ড্রেসিংরুমের বাইরেই রেখে আসতে হয়। কাতার বিশ্বকাপের পর এবারও লে ব্লু এবং অ্যাটলাস লায়ন্সদের লড়াইয়ে এমবাপ্পের গতিকে আটকানোর মূল দায়িত্ব ছিল হাকিমির ওপর।
রাফিনিয়া-ভিনিসিয়ুস
শুধু দ্বৈরথ নয়। বিশ্বকাপে রয়েছে বন্ধুত্বের গল্পও। হেক্সা জয়ের মিশন নিয়ে আসা ব্রাজিল শেষ ষোলোর লড়াইয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছে। বিদায়ের ম্যাচের শেষে মাঠে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ক্লাব ফুটবলে স্প্যানিশ ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনার হয়ে খেলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং রাফিনিয়া। এল ক্লাসিকোর উত্তেজনায় তারা একে অপরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও, সেলেসাওদের হলুদ জার্সি তাদের বাঁধে এক সুতোয়। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর বার্সার রাফিনিয়া এবং রিয়ালের ভিনিসিয়ুসের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্যটি ফুটবল বিশ্বের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
যুদ্ধ শেষে আবার বন্ধু
বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ মঞ্চে আবেগের কোনো স্থান নেই, এই প্রবাদটি ফুটবলাররা প্রতি ম্যাচেই প্রমাণ করেন। জয়ের জন্য, দেশের কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তারা নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে দ্বিধা করেন না। সেখানে সতীর্থের পায়ে কঠিন ট্যাকেল করতে কিংবা বন্ধুর গোল করার প্রচেষ্টা নস্যাৎ করতে বুক কাঁপে না কারও। তবে এই নিষ্ঠুরতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। ৯০ মিনিটের যুদ্ধ শেষে যখন রেফারি শেষ বাঁশি বাজান, তখনই উবে যায় সমস্ত কৃত্রিম শত্রুতা। পরাজিত বন্ধুকে বুকে টেনে নিয়ে বিজয়ী বন্ধুর সান্ত¡না দেওয়া, কিংবা মাঠের ভেতরেই জার্সি বদল করে পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার দৃশ্যগুলোই ফুটবলকে সুন্দর খেলায় পরিণত করে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন