বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সৌন্দর্যের চেয়ে ফলই শেষ কথা। তবে যখন ফলের সঙ্গে নান্দনিক ফুটবল, কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা যোগ হয়, তখন সেই ম্যাচ হয়ে ওঠে বিশ্বকাপের স্মরণীয় অধ্যায়। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন ও বেলজিয়ামের লড়াই ছিল ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ। ইউরোপের দুই শক্তিশালী দলের এই মহারণে শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্পেন। ৮৮ মিনিট পর্যন্ত সমতায় থাকা ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর জয়সূচক গোল ‘লা রোহা’কে পৌঁছে দেয় সেমিফাইনালে।
ম্যাচ শেষে স্পেনের খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাসই বলে দিচ্ছিল, এটি ছিল কেবল একটি জয় নয়; বরং বিশ্বকাপের শিরোপার পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করা। অন্যদিকে বেলজিয়ামের ফুটবলারদের হতাশ মুখ মনে করিয়ে দিচ্ছিল, নকআউট ফুটবলে সামান্য একটি ভুলও কত বড় মূল্য চুকাতে বাধ্য করতে পারে।
১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন
এই জয়ের মাধ্যমে স্পেন শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের বাধাই পেরোয়নি, ফিরেছে বিশ্বকাপের শেষ চারের মঞ্চেও। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি ‘লা রোহা’। ২০১৪ সালে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়, ২০১৮ সালে শেষ ষোলো এবং ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই থেমে যেতে হয়েছিল তাদের। সেই হতাশার অধ্যায়ের ইতি টেনে ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল স্পেন।
এই অর্জন শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়, বরং স্প্যানিশ ফুটবলের পুনর্জাগরণেরও প্রতীক। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি, গাভি ও ফাবিয়ান রুইসদের মতো নতুন প্রজন্মের প্রতিভার সঙ্গে রদ্রির অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলটি আবারও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শুরু থেকেই স্পেনের নিয়ন্ত্রণ, পাল্টা লড়াইয়ে বেলজিয়াম
লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখে স্পেন। ছোট ছোট পাস, দ্রুত পজিশন বদল এবং উইং ব্যবহার করে তারা বেলজিয়ামের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস দুই প্রান্ত থেকে আক্রমণের গতি বাড়াতে থাকেন, আর মাঝমাঠে রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইস খেলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
বেলজিয়াম শুরুতে কিছুটা রক্ষণাত্মক থাকলেও সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করছিল। রোমেলু লুকাকুকে লক্ষ্য করে লম্বা বল এবং চার্লস ডি কেটেলারের সৃজনশীল পাসিং ছিল তাদের প্রধান কৌশল।
ক্রমাগত চাপের ফল আসে প্রথমার্ধের ৩০ মিনিটে। দারুণ এক দলগত আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ফাবিয়ান রুইস নিখুঁত শটে স্পেনকে এগিয়ে দেন। গোলটি ছিল স্প্যানিশ পাসিং ফুটবলের একটি অনন্য উদাহরণ।
সমতা ফিরিয়ে ম্যাচে প্রাণ ফেরায় বেলজিয়াম
গোল হজম করার পর অনেক দল ভেঙে পড়লেও বেলজিয়াম তা হতে দেয়নি। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা নিজেদের গুছিয়ে নেয়। ডান-প্রান্ত থেকে নিখুঁত ক্রসে চার্লস ডি কেটেলারে শক্তিশালী হেডে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান।
এই গোলের পর ম্যাচের গতি পাল্টে যায়। স্পেন আগের চেয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, আর বেলজিয়াম আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে পাল্টা আক্রমণে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে দুই দলই গোলের সুযোগ তৈরি করলেও আর কোনো দল সফল হতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলের লড়াই
বিরতির পর ম্যাচটি পরিণত হয় দুই কোচের কৌশলগত লড়াইয়ে। স্পেন বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্য নিয়ে আক্রমণ সাজাতে থাকে। অন্যদিকে বেলজিয়াম নিজেদের রক্ষণকে আরও শক্ত করে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
রদ্রি মাঝমাঠে অসাধারণ দক্ষতায় খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি শুধু বল কাড়েননি, বরং আক্রমণ শুরু করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফাবিয়ান রুইস ও পেদ্রি মাঝমাঠে অসংখ্য ছোট পাসে বেলজিয়ামের ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখেন।
মেরিনোর জাদুতে শেষ মুহূর্তের জয়
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখনই আসে সেই কাক্সিক্ষত মুহূর্ত। ৮৮তম মিনিটে স্পেনের আক্রমণ থেকে নেওয়া শট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি বেলজিয়ামের গোলরক্ষক। ফিরে আসা বলের ওপর সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিকেল মেরিনো জালে বল জড়িয়ে দেন।
পুরো স্টেডিয়াম তখন স্প্যানিশ সমর্থকদের উল্লাসে কেঁপে ওঠে। শেষ কয়েক মিনিটে মরিয়া হয়ে সমতায় ফেরার চেষ্টা চালায় বেলজিয়াম, কিন্তু স্পেনের রক্ষণ আর কোনো সুযোগ দেয়নি।
যে খেলোয়াড়রা পার্থক্য গড়ে দিলেন
এই ম্যাচে ফাবিয়ান রুইস ছিলেন স্পেনের অন্যতম সেরা পারফর্মার। গোল করার পাশাপাশি মাঝমাঠে তার নিয়ন্ত্রণ দলকে এগিয়ে রাখে। রদ্রি আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্বের সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের একজন। তার পজিশনিং, পাসিং এবং বল পুনরুদ্ধারের দক্ষতা স্পেনকে ভারসাম্য এনে দেয়।
মাত্র কিশোর বয়সেই লামিন ইয়ামাল বড় ম্যাচে নিজের পরিণত ফুটবল দিয়ে মুগ্ধ করেছেন। তার গতি ও ড্রিবলিং বেলজিয়ামের রক্ষণকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে। নিকো উইলিয়ামসও বাঁ-প্রান্তে সমান কার্যকর ছিলেন।
বদলি হিসেবে নেমে মিকেল মেরিনো আবারও ম্যাচের নায়ক। নকআউট পর্বে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে স্পেনের নির্ভরযোগ্য অস্ত্রে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের হয়ে চার্লস ডি কেটেলারে ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল। তার গোল এবং আক্রমণ পরিচালনার দক্ষতা প্রশংসা কুড়িয়েছে। লুকাকু যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও স্পেনের রক্ষণ তাকে কার্যকর হতে দেয়নি।
বেলজিয়ামের বিদায়, তবু লড়াইয়ের প্রশংসা
পরাজয় সত্ত্বেও বেলজিয়াম এই বিশ্বকাপে ইতিবাচক ফুটবল খেলেছে। তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া দলটি কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে মনোযোগের ঘাটতি এবং স্পেনের নিরলস চাপই তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
এবার সামনে ফ্রান্স
এই জয়ের মধ্য দিয়ে স্পেন এখন সেমিফাইনালে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আরেক ইউরোপীয় পরাশক্তি ফ্রান্স। দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় এটি হতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ম্যাচগুলোর একটি।
স্পেনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে ফ্রান্সের দ্রুতগতির আক্রমণ সামলানো। তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যেভাবে ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং কৌশলগত পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে, তাতে স্প্যানিশ সমর্থকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতেই পারেন।
বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু প্রতিভা নয়, প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেন সেটিই করেছে। ম্যাচজুড়ে নিজেদের ফুটবল দর্শনে অটল থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। আর সেই বিশ্বাসের পুরস্কার হিসেবেই এসেছে সেমিফাইনালের টিকিট। এখন আর মাত্র দুটি জয় দূরে বিশ্বকাপের স্বপ্ন। স্পেন কি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে? তার উত্তর মিলবে আগামী লড়াইয়ে।

