ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাবাণিজ্য

 মির্জা হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম

ফুটবলকে বলা হয় দ্য বিউটিফুল গেম। তবে আধুনিক যুগে এই সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল অর্থের জৌলুস ও বাণিজ্যিক সমীকরণ। ফুটবল বিশ্বকাপের আগমন মানেই কোটি কোটি ভক্তের উন্মাদনা, গ্যালারির গর্জন ও মাঠের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু এর সমান্তরালে মাঠের বাইরে চলে আরেক বিশাল যুদ্ধ। আর তা হলো আর্থিক লাভ-ক্ষতি, স্পনসরশিপ আর রেকর্ড ভাঙা আয়ের হিসাব-নিকাশ। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা পরিচালিত এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্টটি এখন আর কেবল ট্রফি জেতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি রূপ নিয়েছে বিশ্বের অন্যতম লাভজনক এক অর্থনৈতিক মহাযজ্ঞে। সাম্প্রতিক সময়ে ফিফার প্রাইজমানি ও আয়ের যে গ্রাফ, তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফুটবল আজ কেবল বিনোদন নয়, বরং এক বিশাল বহুজাতিক বাণিজ্যের সমার্থক।

প্রাইজমানির নয়া রেকর্ড

এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর জন্য ফিফা যে অর্থ বরাদ্দ করেছে, তা পূর্বের সব রেকর্ডকে অনায়াসেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এবারের টুর্নামেন্টের মোট পুরস্কার তহবিলের আকার দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এই অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যেখানে মোট প্রাইজমানি ছিল ৪৪ কোটি ডলার, এবার তা এক লাফে প্রায় শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই বিপুল তহবিলের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে চ্যাম্পিয়ন দলের পকেটে। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা যখন ২০২২ সালে সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছিল, তখন তারা পেয়েছিল ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। তবে এবারের বিশ্বজয়ী দল ট্রফির পাশাপাশি ঘরে তুলবে ৫ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের বিশাল অঙ্কের চেক, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬২৬ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার সমান। রানার্সআপ দলের কপালে

জুটবে ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ৪১৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। আর্থিক প্রাপ্তির এই জোয়ার কেবল ফাইনালিস্টদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। টুর্নামেন্টের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে বিপুল অঙ্কের হাতছানি। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অর্জনকারী দল দুটি পাবে যথাক্রমে ৩ কোটি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এমনকি কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোর প্রত্যেকে পাবে ২ কোটি ডলার (প্রায় ২৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা)। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপ অর্থাৎ শেষ ১৬-তে জায়গা করে নেওয়া দলগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। গ্রুপ পর্বের লড়াই শেষে যারা ১৭ থেকে ৩২তম স্থানের মধ্যে থাকবে, তারা পাবে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ৩৩ থেকে ৪৮তম স্থানে থাকা একেবারে তলানির দলগুলোর জন্যও নির্ধারিত রয়েছে ১ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এই অবস্থানভিত্তিক পুরস্কারের বাইরেও অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের জন্য ১ কোটি ডলারের পার্টিসিপেশন ফি এবং ২৫ লাখ ডলারের প্রস্তুতি ফি নিশ্চিত করা হয়েছে, যার অর্থÑ মাঠে পারফরম্যান্স যেমনই হোক না কেন, বিশ্বমঞ্চে পা রাখার সুবাদেই প্রতিটি দেশ অন্তত ১ কোটি ২৫ লাখ মার্কিন ডলারের আর্থিক নিশ্চয়তা পাচ্ছে।

ফিফার আয়ের উৎস

পুরস্কারের এই বিশাল অংক দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হলেও, ফিফা নিজে টুর্নামেন্ট থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে, তার তুলনায় এই প্রাইজমানি নিতান্তই নগণ্য। এবারের টুর্নামেন্ট থেকে ফিফার মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার।

এই বিশাল রাজস্বের মাত্র ৬.৭ শতাংশ ফিফা প্রাইজমানি হিসেবে দলগুলোর পেছনে ব্যয় করছে। একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে ফিফা অবশ্য দাবি করে থাকে যে, এই আয়ের সিংহভাগÑ প্রায় ১১.৭ বিলিয়ন ডলার। তারা বিশ্বজুড়ে ফুটবলের পরিকাঠামো উন্নয়ন, তৃণমূলের ফুটবলার তৈরি এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কল্যাণে পুনর্বিনিয়োগ করবে।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বিশাল অর্থভান্ডার আসে কোথা থেকে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ফিফার বহুমুখী বাণিজ্যিক কৌশলের গভীরে। আয়ের সবচেয়ে বড় খাতটি হলো টেলিভিশন স্বত্ব বা ব্রডকাস্টিং রাইটস, যেখান থেকে আসছে প্রায় ৪২৬ কোটি ডলার। এরপরই রয়েছে বিশ্বের নামি-দামি করপোরেট ব্র্যান্ডগুলোর স্পনসরশিপ ও লাইসেন্সিং চুক্তি, যা ফিফার তহবিলে যোগ করছে ৩২০ কোটি ডলার। আর মাঠের টিকিট বিক্রি থেকে সরাসরি আয় হচ্ছে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে, আর তাতেই কপাল খুলেছে ফিফার। দর্শক সমাগম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সম্প্রচার পরিধি বাড়ায় বিজ্ঞাপনের বাজার এখন আকাশচুম্বী।

আধুনিক বিপণন

ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিফা এবার তাদের বিপণন কৌশলে এনেছে আমূল পরিবর্তন। প্রথাগত টেলিভিশন সম্প্রচারের পাশাপাশি এবার সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট টিকটক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে মনিটাইজ করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের ধরে রাখতে প্রতিটি ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে, যা কোটি কোটি ভিউয়ারশিপ ও নতুন স্পনসর আকর্ষণের এক অনন্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় চমক ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে টিকিটের ক্ষেত্রে ফিফার নতুন ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ বা গতিশীল মূল্যনির্ধারণ পদ্ধতি। এই নিয়মে টিকিটের চাহিদা যত বাড়ে, দামও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এই কৌশলের কারণে ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের দাম কালোবাজারি ছাড়াই প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই ঠেকেছে প্রায় ১১ হাজার মার্কিন ডলারে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের প্রাথমিক টিকিটের মূল্য যেখানে ছিল ১ হাজার ৬০০ ডলার, এবার তা প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই দাম আকাশচুম্বী হলেও, করপোরেট ধনকুবের আর ফুটবল পাগল ধনীদের কল্যাণে টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ সমর্থকদের পকেট খালি হলেও ফিফার আয়ের খাতা দিন দিন ভারী হচ্ছে।

ফুটবলার ও কর্মকর্তাদের পকেট

ফিফার এই রমরমা বাণিজ্যের প্রভাব কেবল সংস্থাটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই পড়ছে না, এর আঁচ লাগছে ফুটবল সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আয়ের ওপরেও। সংস্থাটির সভাপতি ইনফান্তিনো কিংবা শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকদের বার্ষিক আয় এখন যেকোনো বহুজাতিক কোম্পানির সিইও-দের সমকক্ষ। কেবল ২০২৫ সালেই ফিফা প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আয় ছিল ৬১ লাখ মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশ (২৮ লাখ ডলার) এসেছে নতুন আঙ্গিকের ক্লাব বিশ্বকাপ থেকে প্রাপ্ত বোনাস হিসেবে। এই তথ্যাদি প্রমাণ করে যে, মাঠের ফুটবলাররা যেমন কোটি কোটি টাকার চুক্তি ও বোনাস পাচ্ছেন, তেমনি পর্দার আড়ালে থাকা সংগঠকরাও ফুটবলের এই বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে ভুল করছেন না।