ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

ফুটবলের ধ্রুপদি ত্রয়ী

হাসিন রায়হান
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম

ইতিহাসের পাতায় শিল্প-বিপ্লব কিংবা রাজনৈতিক পালাবদল যেভাবে সমাজকে ভেঙে গড়েছে, ফুটবলের ক্যানভাসেও তেমনি কিছু কৌশলগত যুগলবন্দি বদলে দিয়েছে এই খেলার গতিপথ। ফুটবল মূলত দলীয় খেলা, এগারো জনের সমবায়ী সাধনা। কিন্তু ইতিহাসের কিছু অমোঘ মুহূর্তে এই এগারো জনের ভেতর থেকে তিনজনের এমন এক একটি স্বতন্ত্র বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা পুরো মাঠের ব্যাকরণকে একক নিয়ন্ত্রণে এনেছে। রসায়ন, টেলিপ্যাথিক বোঝাপড়া ও নিখুঁত জ্যামিতিক বিন্যাসে গড়া এই ত্রয়ী বা ট্রায়ো শুধু গোল করেননি, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে করেছেন ব্যবচ্ছেদ, ফুটবলকে দিয়েছেন নতুন এক নান্দনিক ভাষা। সাম্প্রতিক সময়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল ওলিসের সমন্বয়ে ফরাসি আক্রমণভাগের যে রাজকীয় উত্থান আমরা দেখছি, তা ফুটবল রোমান্টিকদের বাধ্য করেছে ইতিহাসের ধুলো জমা পাতাগুলো উল্টে দেখতে। পেলের সেই জাদুকরী সত্তর, ব্রাজিলের ২০০২ সালের থ্রি-আর কিংবা ক্লাব ফুটবলের এমএসএন ও বিবিসি; ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসনে বসা এই ত্রয়ীদের কীর্তিগাথা যেন এক একটি যুগান্তকারী কাব্য।

সত্তরের ব্রাজিল

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমান্টিক এবং বিধ্বংসী আক্রমণের খোঁজে যদি ষাট বা সত্তরের দশকে ফিরে যাওয়া যায়, তবে দেখা যাবে তখন ত্রয়ীর ধারণার চেয়েও বেশি প্রাধান্য পেত চার বা পাঁচ ফরোয়ার্ডের সর্বগ্রাসী আক্রমণ। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেই কিংবদন্তি দলটির কথা বলা যায়, যেখানে একই সঙ্গে মাঠে রাজত্ব করতেন পেলে, তোস্তাও, জেয়ারজিনহো এবং রিভেলিনো। তাত্ত্বিকভাবে তারা চারজন হলেও, মাঠের ভেতর পেলের প্রধান সহযোগী হিসেবে জেয়ারজিনহো এবং তোস্তাও যে ত্রিমুখী আক্রমণের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, তাকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রথম সফল ত্রয়ী-নকশা বলা চলে। জেয়ারজিনহোর গতি, তোস্তাওয়ের বুদ্ধিদীপ্ত পাসিং আর পেলের অতিমানবীয় ফিনিশিংয়ের সেই রসায়ন ছিল ডিফেন্ডারদের জন্য দুঃস্বপ্ন।

থ্রি-আর

সত্তরের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে একক আধিপত্যের এমন নিখুঁত ত্রয়ী দেখতে বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ তিন দশক। ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে লুইস ফিলিপ স্কোলারির ব্রাজিল দল মাঠে নামে। তাদের নামের পাশে তখন ফেবারিট তকমাটা খুব একটা জোরালো ছিল না। কিন্তু টুর্নামেন্ট যত এগোল, এশিয়ার আকাশ সাক্ষী হলো এক নতুন মিথের। যার নাম থ্রি-আর। রোনালদো নাজারিও, রিভালদো এবং তরুণ রোনালদিনিও। এই তিনজনের রসায়ন ছিল একাধারে আদিম ক্ষিপ্রতা এবং আধুনিক ফুটবলের বুদ্ধিমত্তার মিশেল। ওল্ড স্কুল নাম্বার নাইন হিসেবে রোনালদোর বক্সে ঢুকে পড়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, রিভালদোর বাঁ পায়ের নিখুঁত ড্রাইভ ও দূরপাল্লার শট, আর তরতাজা রোনালদিনিওর ড্রিবলিং ও ডিফেন্স-চেরা পাস; এই তিন শক্তির মেলবন্ধনে প্রতিপক্ষ দলগুলো খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল। পুরো টুর্নামেন্টে রোনালদোর ৮ গোল এবং রিভালদোর ৫ গোল, একই বিশ্বকাপে এক দলের দুই খেলোয়াড়ের এমন কীর্তি বিশ্ব ফুটবল শেষ দেখেছিল সেই ২০০২ সালে। আর সেই আক্রমণের পেছনের মূল কারিগর ছিলেন তরুণ রোনালদিনিও। এই ত্রয়ীর মোট ২০টি গোল ও অ্যাসিস্টের ওপর ভর করেই সেবার সেলেসাওরা তাদের পঞ্চম বিশ্বজয় নিশ্চিত করেছিল।

এমএসএন

আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে যদি ক্লাব ফুটবলের আঙিনায় দৃষ্টিপাত করা যায়, তবে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্পে এক অভূতপূর্ব লাতিন মহাকাব্যের জন্ম হয়েছিল। লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ এবং নেইমার জুনিয়র, ফুটবলবিশ্ব যাদের ভালোবেসে নাম দিয়েছিল এমএসএন। লাতিন আমেরিকার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী তিন দেশের তিন মহাতারকা যখন এক ক্লাবে জড়ো হলেন, অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন ইগোর লড়াইয়ে হয়তো ভেস্তে যাবে এই প্রজেক্ট। কিন্তু মাঠের ভেতরের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৪ থেকে ২০১৭, তিন বছরে ফুটবলবিশ্ব দেখেছে ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী এবং বিনোদনদায়ী ফুটবল। মেসি রাইট উইং থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা তৈরি করতেন, সুয়ারেজ বক্সের ভেতর শরীরী ফুটবল ও ক্ষিপ্র ফিনিশিংয়ে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতেন, আর নেইমার লেফট উইং দিয়ে ডিফেন্ডারদের নাচাতেন সাম্বা ড্রিবলিংয়ে। তাদের বোঝাপড়াটা এতটাই গভীর ছিল যে, না তাকিয়েও তারা একে অপরের অবস্থান টের পেতেন। ২০১৫ সালে বার্সেলোনার ট্রেবল জয়ের পেছনে এই ত্রয়ীর অবদান ছিল ১২২টি গোল। পরের বছর তারা সেই রেকর্ড ভেঙে করলেন ১৩১ গোল। এমএসএনের বিশেষত্ব ছিল তাদের নিঃস্বার্থ মানসিকতা। পেনাল্টি বা ফাঁকা গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়েও একে অপরকে গোল করানোর যে আনন্দ তারা উদযাপন করতেন, তা আধুনিক ফুটবলে বিরল।

বিবিসি

বার্সেলোনা যখন ন্যু ক্যাম্পে লাতিন কাব্যের চর্চা করছে, ঠিক তখনই স্পেনে মাদ্রিদে গড়ে উঠেছিল তার এক উপযুক্ত প্রতিষেধক। রিয়াল মাদ্রিদের গ্যারেথ বেল, করিম বেনজেমা এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, সংক্ষেপে বিবিসি। বার্সেলোনার এমএসএন যদি হয় শৈল্পিক কবিতা, তবে রিয়ালের বিবিসি ছিল আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত, যান্ত্রিক এবং বিধ্বংসী যুদ্ধবিমান। গতি, শারীরিক শক্তি আর প্রতি-আক্রমণের এমন সংহারক রূপ ফুটবল এর আগে কখনো দেখেনি। বেনজেমা এখানে খেলতেন ফলস নাইন বা স্পেস ক্রিয়েটর হিসেবে, যিনি নিজের মার্কারকে টেনে নিয়ে জায়গা করে দিতেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য। আর রোনালদো সেই সুযোগে বক্সে ঢুকে হতেন মূল জল্লাদ। অন্যদিকে রাইট উইংয়ে গ্যারেথ বেলের অলৌকিক গতি ও দূরপাল্লার শট প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বিভক্ত করে ফেলত। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদের টানা তিনটিসহ মোট চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের মূল ভিত্তিভূমি ছিল এই ত্রয়ী। মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইনালগুলোতে বেলের কিক কিংবা রোনালদোর অতিমানবীয় গোলগুলো রিয়ালকে ইউরোপের শাসকে পরিণত করেছিল।

আধুনিক ত্রয়ী রূপকথা

ইতিহাসের এই সমস্ত কিংবদন্তি ত্রয়ীর প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই বর্তমান বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বর্তমান আক্রমণভাগকে মূল্যায়ন করতে হবে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল ওলিস, এই তিন তরুণের পা খোদাই করে চলেছে ফরাসি ফুটবলের নতুন ইতিহাস। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি দলে এমবাপ্পের সঙ্গী ছিলেন গ্রিজমান ও জিরু, যেখানে জিরুর ভূমিকা ছিল মূলত ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখা। কিন্তু এবারের ত্রয়ীর চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রত্যেকেই গতিশীল, প্রত্যেকেই একক দক্ষতায় ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতাসম্পন্ন।

চলতি বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ইতোমধ্যে ৮টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট তাকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার আগে রেখেছে। দেম্বেলের পাঁচ গোল এবং হ্যাটট্রিক প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন উইঙ্গার নন, একজন জাত স্ট্রাইকারও বটে। ২০০২ সালের রোনালদো-রিভালদোর সেই বিখ্যাত ৮ ও ৫ গোলের কীর্তিতে ভাগ বসিয়েছেন এই ফরাসি জুটি। আর এই আক্রমণের মূল সুতোটি যার হাতে, তিনি মাইকেল ওলিসে। গোল না পেলেও পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে তিনি পেলের এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ছয় অ্যাসিস্টের অমর কীর্তির একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। ইতোমধ্যে এই বিশ্বকাপে তাদের সম্মিলিত গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩-এ, যা ২০০২ সালের ব্রাজিলের সেই থ্রি-আর (২০টি)-কেও ছাড়িয়ে গেছে।