ট্রফিজয়ের একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছনোর ম্যাচে পরাজয়, বিশ্বকাপজুড়ে নান্দনিক ও বিধ্বংসী ফুটবল খেলেও ট্রফি জয়ের স্বপ্ন অধরা থেকে যাওয়ার যে চিরন্তন যন্ত্রণা, তা ফুটবলারদের মনকে অবশ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সেমিফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের গ্লানি ও বিষাদ বুকে চেপে, কেবলই নিয়মমাফিক বা আনুষ্ঠানিক একটি ব্রোঞ্জ পদক পাওয়ার লড়াইয়ে মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল ইউরোপের দুই পরাশক্তি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। সাধারণত এই ধরনের সান্ত¡না পুরস্কারের ম্যাচগুলোতে খেলোয়াড়দের মাঝে এক ধরনের নির্লিপ্ততা বা কাঁধ ঝুলে যাওয়া মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এই ম্যাচে যেন সমস্ত অবসাদ ঝেড়ে ফেলে সম্পূর্ণ রণংদেহি মেজাজে অবতীর্ণ হলো দুই দল। যে ম্যাচটিকে ঘিরে ফুটবল ভক্তদের মাঝে তেমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না, সেটিই শেষ পর্যন্ত রূপ নিল অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকর ১০ গোলের মহাকাব্যে। রাত জাগা ফুটবলপ্রেমীরা উপহার পেলেন ভরপুর বিনোদনের পশরা, যেখানে প্রতি-আক্রমণ, বিশ্বরেকর্ডের রোমাঞ্চ শেষে ৬-৪ গোলের জাদুকরী ব্যবধানে জয়ী হয়ে ব্রোঞ্জের মুকুট মাথায় পরল ইংল্যান্ড।
এমন ধামাকা ম্যাচ কিংবা গোলের এমন সর্বগ্রাসী ফিস্টি ম্যাচের আগে আশা করেননি কেউই। কারো পক্ষেই আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না যে মায়ামির মাঠে ঠিক কী ধরনের পরাবাস্তব চিত্রনাট্য লিখিত হতে চলেছে। এমনকি ম্যাচ শুরুর আগের দিন পর্যন্ত ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের দুই শিবিরও কি টের পেয়েছিল এই বিধ্বংসী লড়াইয়ের আগাম সংকেত? প্রাক-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল এবং ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁম সুরে সুর মিলিয়ে যাবতীয় হাইপ ও উত্তেজনায় রীতিমতো জল ঢেলে দিয়েছিলেন। তাদের বয়ানে স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল এক ধরনের অনীহা, যেখানে তারা দুজনেই প্রকারান্তরে স্বীকার করেছিলেন যে এ এক এমন লড়াই, যা কৌশলগতভাবে তাদের কেউই লড়তে নারাজ। বিশ্বজয়ের সুউচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিশ্বকাপের এই পরিবর্ধিত সংস্করণে অংশ নিতে আসা দুই দলের কাছে কেবলই তিন বনাম চারের লড়াইয়ে নামাটা যে এক ধরনের বাহুল্য এবং সময়ের অপচয়, তার জন্য কোনো বিশেষ কৈফিয়তেরও প্রয়োজন বোধ করেননি তারা।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় দুই দলের ফুটবলাররা যেভাবে গোল উদযাপনের উৎসবে মেতে উঠলেন, তা স্কুলের সেই চতুর ক্যামোফ্লাজ-টপার বা প্রথম স্থানাধিকারী ছাত্রের ছদ্মবেশী মানসিকতাকেই মনে করিয়ে দেয়। সেই সুচতুর টপার, যে কিনা পরীক্ষা শুরুর আগে সহপাঠীদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলে অম্লানবদনে জানাত যে তার গোটা সিলেবাস বাকি এবং পরীক্ষার কিছুই প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। ফার্স্ট হওয়া তো দূর, কোনোমতে পাস করে উতরে গেলেই জীবন বাঁচে। এমন কপট কৈফিয়তের ফাঁদে পড়ে ব্যাক বেঞ্চের সরল ছাত্ররা নিশ্চিন্ত হতো। কিন্তু রেজাল্ট বেরোনোর পর দেখা যেত সেই ছদ্মবেশী টপারই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে মায়ের হাতের পায়েস খাচ্ছে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডও মায়ামির মাঠে ঠিক সেই টপারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। ম্যাচের আগে অনাগ্রহের অভিনয় করলেও, মাঠের ভেতরে তারা উপহার দিল চলতি বিশ্বকাপের তর্কাতীতভাবে সবচেয়ে বিধ্বংসী ও রোমহর্ষক খেলা, যার সুবাদে একই সঙ্গে ফুটবল বিশ্বের কাছ থেকে সাবাশি ও কানমলা দুই-ই প্রাপ্য এই দুই দলের।
ম্যাচের প্রথমার্ধের খেলা দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন বোধহয় পরীক্ষাটি শুরু হতেই শেষ হয়ে গেছে। খেলার মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানকে সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে ডেক্লান রাইস প্রথম বলটি জালে জড়ালেন। তখনো কেউ বুঝতে পারেননি এই ম্যাচটি ইতিহাসের পাতায় ঠিক কীভাবে নিজের নাম খোদাই করতে যাচ্ছে। শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ১৮ মিনিটের মাথায় সেই রাইসেরই এক নিখুঁত কর্নার থেকে মাথা ছুঁইয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ডিফেন্ডার এজরি কনসা। আর এর পরেই শুরু হয় উইঙ্গার বুকায়ো সাকার শৈল্পিক তা-ব। অফসাইডের কারণে তার একটি চমৎকার গোল বাতিল হলেও, ফরাসি ডিফেন্স লাইনকে কার্যত চোখের জলে নাকের জলে নাচিয়ে ছাড়লেন আর্সেনালের এই তরুণ তারকা। প্রথমার্ধের বাঁশি বাজার আগেই সাকার জোড়া গোলে স্কোরলাইন অবিশ্বাস্যভাবে ৪-০ করে ফেলে ইংল্যান্ড। ১৯৩০ সালের পর এই প্রথমবার বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধেই চার-চারটি গোল হজম করার চরম লজ্জায় ডুবল ফরাসি ফুটবল। গ্যালারিতে বসা ইংরেজ সমর্থকরাও তখন উল্লাসের পাশাপাশি কপালে হাত দিয়ে ভাবছিলেন, টুখেল যদি এই বিধ্বংসী সিলেবাসটি সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে একটু ঝালিয়ে নিতেন, তবে আজ ব্রোঞ্জের পদক নয়, বরং বিশ্বকাপের মূল সোনালি ট্রফিটির জন্য লড়াই করা যেত। সান্ত¡না পদক পেলেও সেমিফাইনালে জার্মান কোচের অকারণ রক্ষণাত্মক ও ভীরু স্ট্র্যাটেজি নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তা এই প্রথমার্ধের আক্রমণাত্মক ফুটবলেই প্রমাণিত হয়ে যায়।
তবে ফরাসি ফুটবল অনুরাগীদের জন্য নাটকীয়তা তখনো বাকি ছিল। ফরাসি জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে এটাই ছিল কিংবদন্তি দিদিয়ের দেশঁমের ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। প্রথমার্ধের এমন জঘন্য ও দিশাহারা পারফরম্যান্সের পর ড্রেসিংরুমে ফরাসি কোচ যে কেবল তাত্ত্বিক পরামর্শ বা পেপ টক দিয়ে ক্ষান্ত হননি, বরং ফুটবলারদের রীতিমতো কড়া ধমক দিয়ে আড়ংধোলাই দিয়েছেন, তা দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পরিষ্কার হয়ে যায়। বিরতির পর খোলস ছেড়ে নিজের রুদ্ররূপে মাঠে নামেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৪৮ মিনিটে তার গোল এবং ঠিক তার ছয় মিনিট পর ৫৪ মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলার নিখুঁত লক্ষ্যভেদে ফরাসি শিবিরে প্রাণ সঞ্চারিত হয়। ম্যাচের ৬৬ মিনিটে ফের একবার জ্বলে ওঠেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরাসি সুপারস্টার। এক দুর্দান্ত ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ৪-৩ করে তিনি ম্যাচটিকে নিয়ে আসেন অভাবনীয় রোমাঞ্চের দোরগোড়ায়।
আর এই গোলের সুবাদেই বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে রচিত হয় নতুন স্বর্ণালি অধ্যায়। বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের নিরিখে আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসিকে টপকে সর্বকালের সেরার সিংহাসনে এককভাবে উপবিষ্ট হন ফরাসি অধিনায়ক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ম্যাচে জোড়া গোল করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে এমবাপ্পের মোট গোলসংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ২২টিতে, যা মেসির ২১ গোলের মহাকাব্যিক রেকর্ডকে পেছনে ফেলে তাকে এনে দেয় বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ গোলদাতার রাজকীয় মুকুট। বিশ্বজয়ের স্বপ্ন অধরা থাকলেও, এমবাপ্পে প্রমাণ করলেন যে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় তার পতাকা এখনো উড়ছে।
ম্যাচ তখন রুদ্ধশ্বাস পেন্ডুলামের মতো দুলছে, যেখানে ব্যাকবেঞ্চার ফরাসিরা রীতিমতো ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে ক্লাস-টপার ইংলিশদের। ঠিক এমন মুহূর্তে, ম্যাচের ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ঠান্ডা মাথার শটে নিজের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন বুকায়ো সাকা। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে জিওফ হার্স্টের পর এই প্রথম নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচে কোনো ইংরেজ ফুটবলারের হ্যাটট্রিক করার বিরল ও অনন্য নজির স্থাপিত হলো সাকার হাত ধরে। কিন্তু এ রাতে এই ফুটবলীয় নাটকের শেষ অঙ্ক তখনো বাকি ছিল। ইনজুরি টাইমের ষষ্ঠ মিনিটে উসমান দেম্বেলের বাঁকানো শট ইংল্যান্ডের জাল স্পর্শ করলে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৫-৪-এ, যা স্টেডিয়ামের উত্তেজনাকে নিয়ে যায় চরমে। খেলা যখন একেবারে শেষের দোরগোড়ায় এবং ফরাসিরা সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া, ঠিক তখনই ৯৮ মিনিটে ফরাসি রক্ষণভাগের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে নিখুঁত দক্ষতায় বল জালে জড়িয়ে ইংরেজদের জয় নিশ্চিত করেন জুড বেলিংহ্যাম, স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৬-৪।
সব মিলিয়ে পুরো ম্যাচে দুই দলের সম্মিলিত আক্রমণের ঝড়ে মোট ৩৮টি শট নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ২০টিই ছিল সরাসরি গোলপোস্টের অন-টার্গেট শট। ১৯৫৮ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রোঞ্জ পদকের ফয়সালায় এত গোল এবং এমন বিধ্বংসী আক্রমণাত্মক ফুটবল আর কখনো দেখেনি বিশ্ববাসী। ১৯৬৬ সালের সেই একমাত্র খেতাব জয়ের ঠিক ছয় দশক পর, ভিনদেশের মাটিতে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য তুলে নিল থ্রি লায়ন্স। আর যে ম্যাচটা টুর্নামেন্টের শুরুতে অবহেলিত ছিল এবং কেউই খেলতে চায়নি, সেটাই শেষ পর্যন্ত
এমন গোলের উৎসবে রূপ নিল, যা শেষ হোক- তা মাঠের বা টিভির সামনে থাকা দর্শকদের কেউই চাননি।

