একসময় ভিডিও গেমের দুনিয়ায় প্লে স্টেশন আর এক্সবক্সের লড়াই ছিল প্রযুক্তিপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। নতুন কোনো কনসোল বাজারে এলেই শুরু হতো তুলনাÑ কোনটির গ্রাফিক্স ভালো, কোনটির এক্সক্লুসিভ গেম বেশি, আবার কোনটির অনলাইন সেবা উন্নত। সেই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার বড় অংশীদার ছিল মাইক্রোসফটের এক্সবক্স। কিন্তু গত কয়েক বছরে বাজারে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে এই ব্র্যান্ড। এখন ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে নতুন কৌশল নিয়ে আবারও গৌরবের পথে ফিরতে চায় এক্সবক্স।
হারিয়ে যাওয়া আধিপত্য
২০০১ সালে যাত্রা শুরু করা এক্সবক্স খুব দ্রুতই কনসোল বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। বিশেষ করে **এক্সবক্স ৩৬০** ছিল মাইক্রোসফটের সবচেয়ে সফল কনসোলগুলোর একটি। উন্নত অনলাইন সেবা, শক্তিশালী হার্ডওয়্যার এবং **হ্যালো**, **গিয়ার্স অব ওয়ার** ও **ফোরজা** সিরিজের মতো জনপ্রিয় এক্সক্লুসিভ গেম এক্সবক্সকে লাখো গেমারের প্রথম পছন্দে পরিণত করেছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজারের চিত্র বদলে যায়। সনি ধারাবাহিকভাবে একের পর এক সফল এক্সক্লুসিভ গেম প্রকাশ করে প্লে স্টেশনের জনপ্রিয়তা বাড়ায়। অন্যদিকে এক্সবক্সের কিছু ব্যাবসায়িক সিদ্ধান্ত তাদের বাজার অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
কোথায় ভুল করেছিল মাইক্রোসফট?
গেমিং বিশ্লেষকদের মতে, এক্সবক্সের বড় ভুল ছিল নিজেদের এক্সক্লুসিভ গেম অন্য প্ল্যাটফর্মেও প্রকাশ করা। ফলে শুধু এক্সবক্স কেনার বিশেষ কারণ অনেকটাই কমে যায়।
এ ছাড়া নতুন গেম প্রকাশের দিন থেকেই গেম পাসে যুক্ত করার নীতি, হার্ডওয়্যারের চেয়ে সফটওয়্যার ও সাবস্ক্রিপশন সেবায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং কয়েকটি গেম স্টুডিও বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তও সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেক গেমারের অভিযোগ ছিল, এক্সবক্স ধীরে ধীরে একটি কনসোল ব্র্যান্ডের বদলে শুধু একটি সফটওয়্যার সেবায় পরিণত হচ্ছিল।
নতুন নেতৃত্ব, নতুন অঙ্গীকার
এক্সবক্সের নতুন নেতৃত্ব সেই ধারা বদলানোর ঘোষণা দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা হলো আবারও কনসোলকে ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা।
ভবিষ্যতে প্রথম পক্ষের বড় গেমগুলো দীর্ঘ সময় এক্সবক্সের জন্য এক্সক্লুসিভ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন হার্ডওয়্যার উন্নয়ন, উন্নত কনট্রোলার, দ্রুতগতির স্টোরেজ প্রযুক্তি এবং আরও শক্তিশালী গেমিং অভিজ্ঞতা দেওয়ার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২৫ বছর পূর্তিতে নতুন উদ্দীপনা
এক্সবক্সের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সংস্করণের কনসোল ও কনট্রোলার উন্মোচন করা হয়েছে। শুধু স্মৃতিচারণ নয়, ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে রয়েছে মাইক্রোসফট। নতুন প্রজন্মের গেমারদের আকৃষ্ট করতে একাধিক বড় বাজেটের গেম উন্নয়নাধীন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বুঝতে পেরেছে, শক্তিশালী এক্সক্লুসিভ গেম ছাড়া কনসোল বাজারে টিকে থাকা কঠিন। তাই নিজস্ব গেম স্টুডিওগুলোর উন্নয়নেও নতুন করে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
প্রতিযোগিতা ফিরলে লাভ গেমারদেরই
গেমিং শিল্পে প্রতিযোগিতা যত বাড়ে, ব্যবহারকারীরা তত বেশি সুবিধা পান। অতীতে এক্সবক্স লাইভের জনপ্রিয়তার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের অনলাইন সেবা উন্নত করতে বাধ্য হয়েছিল। একইভাবে দ্রুত লোডিং প্রযুক্তি, ক্লাউড গেমিং, ক্রস-প্ল্যাটফর্ম মাল্টিপ্লেয়ার এবং উন্নত কনট্রোলারের মতো অনেক প্রযুক্তিই এসেছে এই প্রতিযোগিতার হাত ধরে।
যদি এক্সবক্স আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারে, তা হলে পুরো কনসোল বাজারেই নতুন উদ্ভাবনের গতি বাড়বে।
সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
তবে এক্সবক্সের পথ সহজ নয়। সনির প্লে স্টেশন এখনো বাজারের শীর্ষে। নিন্টেন্ডো তাদের নিজস্ব গেম ও হাইব্রিড কনসোল নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি পিসি গেমিং এবং স্টিমভিত্তিক গেমিং ডিভাইসের জনপ্রিয়তাও দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এক্সবক্সকে শুধু নতুন হার্ডওয়্যার আনলেই হবে না; ধারাবাহিকভাবে মানসম্মত এক্সক্লুসিভ গেম প্রকাশ, ব্যবহারকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
নতুন লড়াই শুরু
এক্সবক্সের সামনে এখন শুধু একটি লক্ষ্যÑ হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা। গত কয়েক বছরের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মাইক্রোসফট যদি নতুন কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তা হলে কনসোল বাজারে আবারও জমে উঠতে পারে প্লে স্টেশন বনাম এক্সবক্সের সেই চিরচেনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আর সেটিই হবে গেমিং বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন