ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দোরগোড়ায়। আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি যে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তা স্পষ্ট। কিন্তু ঘরের ইঁদুরে বান কাটার মতো বিএনপির জন্য এখন চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে দলের মনোনয়নবঞ্চিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর তথ্য, তা হলোÑ এসব প্রার্থীর অনেকেই ওপরে বিএনপির পক্ষে থাকলেও তলে তলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছেন। শুধু তাই নয়, তারা গোপনে বৈঠক করে নিজ নিজ অনুসারীদের দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট দিতে বলছেন।
খুলনা, চট্টগ্রাম বিভাগসহ ঢাকার বেশ কয়েকটি আসনের বিএনপির একাধিক সদ্য মনোনয়নবঞ্চিতদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে দলীয় পদ হারানোর ভয়ে এসব বিষয়ে তারা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। বিশ্লেষকরা বলছেন, একসময় আওয়ামী লীগেও জামায়াত ভর করেছিল গোপনে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বিএনপির ওপর ভর করেছে জামায়াত। এটা আগামী নির্বাচনে বিএনপির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিতে পারে, যদি না এখনই দলের হাই কমান্ড এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন। এ ছাড়া জামায়াতের মধ্যেও বিএনপিপন্থিদের অবস্থান রয়েছে বলে জানা গেছে। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে।
তথ্যমতে, মনোনয়ন না পাওয়া ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতারা জামায়াত, এনসিপি অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে গোপনে সখ্য গড়ে তুলেছেন। এমন একাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর হালহকিকত নজরদারিতে রেখে জানা যায়, তারা ওপরে ওপরে ধানের শীষ কিন্তু ভেতরে ভেতরে জামায়াতের পক্ষে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক। অনেকে গোপন বৈঠক করে নিজের অনুসারীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে।
দেশের সচেতন মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটগুলো যাচ্ছে কোথায়? এটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিগত দিনে লক্ষ করা গেছে, আওয়ামী লীগের মধ্যে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ছিল। জুলাই বিপ্লবের পর সিন থেকে আওয়ামী লীগ আউট হয়ে যায়। এখন বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য। এর কারণ বিএনপিতে জামায়াতের একটি বড় অংশ রয়েছে। ফলে কে আসল বিএনপি, তা বলা মুশকিল। এদিকে অনেকে কাক্সিক্ষত মনোনয়ন না পাওয়ায় তারা গোপনে জামায়াতের পক্ষে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে জামায়াতের ভাষ্য, কেউ অতীতের ভুল স্বীকার করে যদি দ্বীনের পথে ফিরে আসে, তাহলে তাদের স্বাগতম।
আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিতরা
সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় যারা বিএনপির মনোনয়ন পাননি তারাই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে বিএনপিপন্থি রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা হাফিজ জানান, বিএনপিতে ঘাপটি মেরে থাকা ও জামায়াতের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একশ্রেণির মানুষের গন্ধ এখন বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যার কারণে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব শ্রেণির মানুষ ওপরে বিএনপির পক্ষে থাকলেও ভেতরে জামায়াতের আদর্শ ধারণ করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এ বিষয়ে বলেন, বিএনপির পদধারী অথবা তার পরিবারের কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও দল তাকে বহিষ্কার করবে। দলের কেউ যদি ধানের শীষের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে বিএনপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি ঋণখেলাপির দায়ে কারো মনোনয়ন বাতিল হলে বা সংগঠনের বিরুদ্ধে গেলেই বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে দলীয় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সূত্রমতে, ঋণখেলাপির অভিযোগে যশোর-৪ (বাঘারপাড়া, অভয়নগর ও বসুন্দিয়া) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী টি. এস. আইয়ুবের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ছাড়া বাতিল হওয়া দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়া এবং ঋণখেলাপির অভিযোগে চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। গত শনিবার ঋণখেলাপির অভিযোগে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল করে ইসি।
এদিকে যশোর-৪ আসনে টি. এস. আইয়ুব প্রার্থিতা ফিরে পেতে গত রোববার উচ্চ আদালতে আপিল করলে আদালত তা খারিজ করে দেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজীকে প্রতীক বরাদ্দ দিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি ইস্যু করেছে বিএনপি। এই এলাকার একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের দাবি টি. এস. আইয়ুব প্রার্থিতা ফিরে না পেলে তারা সবাই জামায়াতে ভোট দেবেন। যশোর-৪ আসনের ভোটার মিন্টু জানান, মতিয়ার রহমান ফারাজীকে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক দিয়েছে। আমি টি.এস. ভাইয়ের ভক্ত। তিনি মনোনয়ন না পেলে ভোট জামায়াতকে দেব। অভয়নগর উপজেলার টি.এস. আইয়ুব ভক্ত ফিরোজ মুন্সিও একই কথা বলেন। ‘আপনি কি ওপরে বিএনপি ভেতরে জামায়াত’Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা যদি ধরে নেন তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।
জোট নিয়ে সন্তুষ্টি থাকলেও স্বতন্ত্র ও বঞ্চিত প্রার্থী নিয়ে বিপাকে বিএনপি
জোট নিয়ে সন্তুষ্টি থাকলেও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা অস্বস্তিতে ফেলেছে বিএনপিকে। বিএনপির একসময়ের মনোনীত প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চাইলেও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এরপরও ৬৩টির মতো আসনে এখনো দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে আছেন। অনেক জায়গায় মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির বেশকিছু নেতাকর্মী তাদের সন্তানের নামে মনোনয়ন সংগ্রহ করে রেখেছেন, যার সংখ্যা ৩৪। বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সন্তানদের স্বতন্ত্র প্রার্থী করার বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
বিএনপি দপ্তরের সূত্রমতে, বিভিন্ন আসনে দল মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে অনেকের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। ফলে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে যাচ্ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। এর মধ্যে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেননি, তারা উপরে বিএনপির পক্ষে ভোট চাইলেও ভেতরে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপির মধ্যে থেকে যারা দলের প্রতীকের বিরুদ্ধে কাজ করবে দল তাদের বেইমান হিসেবে দেখবে এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। এসব বিষয়ে দল সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি জানান, আমরা আহ্বান জানিয়েছি, দলের সিদ্ধান্তের প্রতি যেন তারা (বিদ্রোহী প্রার্থীরা) শ্রদ্ধাশীল হয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। আশা করছি, তারা তা করবেন। অনেকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহারও করেছেন, অনেকে প্রত্যাহার করবেন বলে জানিয়েছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমার মধ্যেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিএনপির এই নেতা।
বিএনপি সূত্র জানায়, ৫২টি আসনে দলের ৯১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তাদের মধ্যে আছেন দলের পদধারী ও সাবেক নেতারা। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নেওয়ায় ইতোমধ্যে ১২ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে কেন্দ্র থেকে যোগাযোগের পাশাপাশি তাদের ডেকে আলোচনা করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি একরামুজ্জামানের সমর্থক মিয়া হোসাইন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, একরামুজ্জামানকে ধানের শীষ প্রতীক না দিলে আমি বিএনপিকে ভোট দেব না। প্রয়োজনে জামায়াতকে ভোট দেব। ভোলা-১ আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীরের ভক্ত ও স্থানীয় বিএনপির একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আলমগীরের বাইরে ভোলা-১ আসনের মানুষ চিন্তা করে না। তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেলে আমাদের ভোট জামায়াতকে দেব।
সূত্র জানায়, দলীয় পদধারী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের গুলশান কার্যালয়ে ডাকা হচ্ছে। তপশিল অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। বেশ কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে দল মনোনীত প্রার্থীদের সমঝোতা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনেক আসনের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিচ্ছেন। এতে উল্লেখযোগ্য আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেষ মুহূর্তে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই সংখ্যা শূন্যে আনার সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়া জানান, আমি বিএনপির জন্য অনেক কষ্ট করেছি। দল আমাকে অবমূল্যায়ন করল, এর ফল হয়তো পাবে। ঋণখেলাপির অভিযোগে মনোনয়ন বাতিল হওয়া চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর জানান, ঋণখেলাপির অভিযোগে আমার বৈধ প্রার্থিতা বাতিল হলেও দলের ভূমিকা নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। কাজেই সময়েই সবকিছু হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, বিএনপির মনোনয়ন সবাই পাবেনÑ সেটা আশা করা যায় না। দল যাচাই-বাছাই করে যোগ্যদের মনোনয়ন দিচ্ছে। যারা মনোনয়ন পাচ্ছেন না তারা যদি দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেইসঙ্গে যারা দলের সঙ্গে বেইমানি করবেন, তাদের ঠাঁই শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সংগঠনে হবে না। এসব বিষয়ে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যথেষ্ট সতর্ক রয়েছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন