ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে ‘হানিট্র্যাপ’ চক্র

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে নারীদের মাধ্যমে সখ্য গড়ে তোলে। কিছুদিন আলাপচারিতায় ঘনিষ্ঠ হয়ে টার্গেট ব্যক্তিকে দেখা করার জন্য ওই নারী নির্ধারিত একটি ঠিকানা দেয়। নারীর ফাঁদে পড়ে ওই ব্যক্তি দেখা করতে গেলে আগে থেকে ওত পেতে থাকা নারীর সহযোগীরা দেখা করতে যাওয়া ব্যক্তিকে অপহরণ করে একটি ঘরে আটকে আপত্তিজনক ছবি তুলে রাখে। সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে সেখান থেকে টাকা দিয়ে মুক্তি পায় অপহৃত ব্যক্তি। শুধু ওই ব্যক্তিই নয়, বিভিন্ন সময়ে টার্গেট করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ঘরে আটকে রেখে একই কায়দায় একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিত্বে এই চক্রের দুই নারীসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করার পর বেশ চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির ডিসি (ওয়ারী) মল্লিক আহসান উদ্দীন সামি জানান, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে দুই নারীসহ হানিট্র্যাপ চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেনÑ তুলিয়া আক্তার ওরফে সুমি, দুলালী ওরফে মীম, মো. ওমর ফারুক, মো. শফিকুল ইসলাম শান্ত, সজল তালুকদার, ইয়াছিন, মো. নাছির খান, সাদ্দাম, মেহেদী হাসান শাহরিয়া, আজিজুল হাকিম টুটুল, মো. কামরুল ইসলাম ও মো. রাব্বি।

ডিসি মল্লিক আহসান জানান, গত ১১ জানুয়ারি ভোর ৫টার দিকে সায়েদাবাদ জনপথ মোড় এলাকা থেকে এই চক্রের সদস্যরা দুই ব্যক্তিকে অপহরণ করে যাত্রাবাড়ী থানাধীন মাতুয়াইল কবরস্থান রোড এলাকার একটি বাসায় নিয়ে আটক রাখে এবং মারধর করে। এ সময় অজ্ঞাতনামা দুই নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ছবি তুলে রাখে। গ্রেপ্তারকৃতরা অপহৃতদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে আপত্তিকর ছবি তাদের পরিচিতজনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে তারা অপহৃতদের মানিব্যাগে থাকা নগদ ৪৮ হাজার টাকা, দুই ভরি ওজনের রুপার চেইন, একটি হীরার আংটিসহ বিকাশ, ডেবিট কার্ড ও কার্ডের মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে সর্বমোট ৫ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এ ঘটনায় গত ১৩ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়।

তিনি আরও জানান, মামলার সূত্র ধরে তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে চক্রটি একই কায়দায় টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে নারীদের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করে। সেই সম্পর্ক থেকে বিভিন্ন তথ্য ও পারিবারিক পরিচয় জানতে চায় আলাপচারিতায়। এরপর ধীরে ধীরে টার্গেট ব্যক্তিকে বশে আনতে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর দেখা-সাক্ষাতের জন্য অনুরোধ করে। অনেকেই ফাঁদে দেখা করতে গিয়ে চক্রের খপ্পড়ে পড়ে। অনেক সময় টার্গেট ব্যক্তিদের চক্রের নির্ধারিত স্থানে নিয়ে কোনো একটি ঘর বা রুমের মধ্যে আটকে রেখে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে আপত্তিজনক ছবি বা ভিডিও তৈরি করে জিম্মি করে। ওই সব ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।

অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রেপ্তারকৃত তুলিয়া আক্তার সুমির সঙ্গে জনৈক ব্যক্তির পরিচয় হয়। এর সূত্র ধরে সুমি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুরোধ করে। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ ডিসেম্বর ডেমরা থানাধীন স্টাফ কোয়ার্টার হোসেন প্লাজার সামনে গিয়ে ঐ ব্যক্তি সুমির সঙ্গে দেখা করেন। দেখা করার পর সুমি ভিকটিমকে তার বাসায় যাওয়ার অনুরোধ করলে তিনি সুমির বাসায় যান। বাসায় প্রবেশ করার ১০ মিনিটের মধ্যে অজ্ঞাত ছয়-সাত জন তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে তার কাছে ৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তাদের দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করলে তারা তাকে খুন করবে বলে হুমকি দে। তখন তিনি নিরুপায় হয়ে তার সঙ্গে থাকা নগদ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা, ১ ভরি ওজনের স্বর্ণের দুটি আংটি এবং তার পরিবারের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা এনে দেন। পরে তারা বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদান করে বাসা থেকে বের করে দেয়। এ ঘটনায় বাদী মোখলেছুরের অভিযোগের পর ১৩ জানুয়ারি ডেমরা থানায় একটি মামলা রুজু হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, পৃথক দুটি ঘটনার তদন্তে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতরা একই চক্রের সদস্য। গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানার একাধিক টিম ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এই চক্রের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এবং ফাঁদে ফেলে টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নগদ অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়।