প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সংগঠনটির আশঙ্কা, এসব প্রস্তাব বহাল থাকলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমবে এবং ফ্ল্যাটের দাম আরও বেড়ে যাবে।
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম রিজিয়ন) মোহাম্মদ মুরশিদুল হাসানসহ সংগঠনের নেতারা।
ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাত বর্তমানে ক্রেতা সংকট, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থায়ন সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কর আরোপ ও উচ্চ নিবন্ধন ব্যয় বহাল রাখা হলে খাতটি আরও সংকটে পড়বে।
ড. আলী আফজাল বলেন, বর্তমানে জমির মালিককে দেওয়া সাইনিং মানির ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এর পাশাপাশি ডেভেলপারের নির্মিত ফ্ল্যাটের ওপরও জমির মালিককে ১৫ শতাংশ কর দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এতে যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) প্রকল্প নিরুৎসাহিত হবে, নতুন প্রকল্প কমে যাবে এবং বিনিয়োগ হ্রাস পাবে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২৪ ইউনিটের একটি প্রকল্পে জমির মালিক যদি ১২টি ফ্ল্যাট পান এবং সেগুলোর মূল্য ১২ কোটি টাকা হয়, তাহলে তাকে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ প্রায় দুটি ফ্ল্যাটের সমপরিমাণ মূল্য কর বাবদ চলে যাবে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর।
সংবাদ সম্মেলনে জমি, ফ্ল্যাট ও বিল্ডিং ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর পরিশোধ সাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানায় রিহ্যাব। এ জন্য সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ধন্যবাদ জানায় সংগঠনটি।
রিহ্যাবের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসনসহ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পেলে তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তবে সংগঠনটি মনে করে, দীর্ঘমেয়াদে একটি সহজ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কর পরিশোধে মানুষের আগ্রহ বাড়ে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতা কমে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাজেট ঘোষণার আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বৈঠকে নিবন্ধন ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছিল রিহ্যাব। বর্তমানে ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধনে ১৩ শতাংশের বেশি ব্যয় হওয়ায় সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
রিহ্যাবের প্রস্তাব ছিল নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা। সংগঠনটির দাবি, নিবন্ধন ব্যয় কমানো হলে সম্পত্তি লেনদেন বাড়বে, বাজারে স্বচ্ছতা আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাত দেশের প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। তাই এই খাতকে অতিরিক্ত করের বোঝা না দিয়ে বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদে গৃহঋণ, সেকেন্ডারি মার্কেট চালু, নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস এবং আবাসনবান্ধব করনীতিসহ সংগঠনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।
তিনি বলেন, জাতীয় বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর প্রত্যাহার, নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং আবাসন খাতের জন্য বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগঠনের নেতারা।

