চট্টগ্রামে বাবার সম্পত্তি বোনকে দিয়ে দেওয়ায় হানিট্র্যাপে ফেলে নিজের বাবাকে খুন করেছে ছেলে। হত্যার পর বাবার লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল জঙ্গলে। দীর্ঘ দুইবছর পর ক্লুলেস এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো।
পিবিআই জানায়, নিহত মীর মজিবুর রহমান খান (৬০) পেশায় একজন বাবুর্চি ছিলেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব চাম্বল গ্রামে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিনটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি ফটিকছড়িতে দ্বিতীয় স্ত্রীর নানার বাড়িতে থাকতেন। ২০২২ সালে দ্বিতীয় স্ত্রীও ক্যানসারে মারা যান।
সম্পত্তি বিক্রি করে মেয়েকে টাকা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন বড় ছেলে। ক্ষোভ থেকেই বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। নিজের এক প্রেমিকাকে লেলিয়ে দেন ষাটোর্ধ্ব বাবার পেছনে। ফোনে প্রেমের অভিনয় করে ওই নারী ডেকে আনেন প্রবীণ বাবুর্চি মীর মজিবুর রহমান খানকে। এরপর ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে, গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাকে।
এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ভুক্তভোগীর ছেলে মো. বেলাল হোসেন (৩৫) ও তার ভায়রা ভাই (স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী) আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার গ্রেপ্তার পরবর্তী পিবিআই মেট্রো কার্যালয়ে লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরেন পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরে সিএনজি অটোরিকশাচালক বেলাল তার এক পূর্বপরিচিত প্রেমিকাকে এই কাজে ব্যবহার করেন। বেলালের পরামর্শে ওই নারী মজিবুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
২০২৪ সালের ৬ জুন মজিবুর রহমান ফটিকছড়ি থেকে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় মেয়ে সালমার বাসায় বেড়াতে আসেন। পরদিন ৭ জুন সকালে ওই প্রেমিকার আমন্ত্রণে তিনি বাকলিয়া থানা এলাকার আনন্দ সাবান ফ্যাক্টরির কাছের একটি ভাড়া বাসায় যান। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন বেলালের ভায়রা ভাই আব্দুল জলিল।
বাসায় পৌঁছানোর পর মজিবুর রহমানকে ঘুমের ওষুধ মেশানো শরবত খাইয়ে অর্ধচেতন করা হয়। বিকেল ৩টার দিকে জলিল ও ওই নারী মিলে মজিবুর রহমানকে সিএনজি অটোরিকশায় করে সিআরবি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে জলিলের পাহারায় বাবাকে রেখে বেলাল লালদীঘি এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে নিয়ে আসেন।
এরপর মজিবুর রহমানকে মাইক্রোবাসে তুলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয়। সন্ধ্যার পর হালিশহর আর্টিলারি সেন্টারের বিপরীতে সিডিএ আউটার লিংক রোডের পাশে গাড়ি থামিয়ে বেলাল ও জলিল মিলে মজিবুর রহমানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। লাশটি রাস্তার পাশের জঙ্গলে ফেলে তারা পালিয়ে যান।
এদিকে বাবার খোঁজ না পেয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরে নভেম্বরে আদালতে অপহরণ মামলা করেন মেয়ে সালমা খানম। আদালত মামলাটির তদন্তভার দেন পিবিআইকে।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে নগরের কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে মূল পরিকল্পনাকারী ছেলে বেলাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল বাবাকে খুনের কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার (১৪ জুন) ভোররাতে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সহযোগী আব্দুল জলিলকে।
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর ২০২৪ সালের ৯ জুন রাতে হালিশহর থানা-পুলিশ ওই জঙ্গল থেকে সাদা লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছিল। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করে এবং আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি দাফন করা হয়। ক্লু না পাওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হালিশহর থানা-পুলিশ ওই মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেছিল। দুই বছর পর জানা গেল, সেই অজ্ঞাত লাশটিই ছিল নিখোঁজ মজিবুর রহমানের।

