বর্তমান বিএনপি সরকারের এমপি ও মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠদের অনেকে বিগত আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থক বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি আমলে নিয়ে এসব বিষয়ে সতর্ক হচ্ছে সরকার ও সরকারের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, এর মধ্যে বড় একটি অংশ এমপি-মন্ত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।
এদিকে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনেক মন্ত্রী-এমপির পিএস, এপিএস, গাড়িচালক ও নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি সরকারপ্রধানের নজরে আসার পর বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে। তারা এসব বিষয়ে বেশকিছু তথ্য ও প্রমাণও পেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, খুলনা বিভাগের এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন এবং রংপুর বিভাগের তিনজন এমপি, বরিশাল বিভাগের চারজন এমপির দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগ পরিবারের ও সমর্থকগোষ্ঠী। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দায়িত্বরত একজনের এপিএসও আওয়ামী লীগ ও শিবিরের সমর্থক বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, অনেকেই হয়তো ভালো লবিং-তদবির, সুপারিশের মাধ্যমে এমপি-মন্ত্রীদের কাছে ভিড়ছেন। তবে এসব বিষয়ে সরকারের সতর্ক থাকা উচিত। এ ধরনের মানুষ যদি সরকারের বিভিন্ন মহলে থাকে, তাহলে সরকার যেকোনো সময় রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে। কারণ পিএস, এপিএস, গাড়িচালক ও নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তিরা বিগত শেখ হাসিনা সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চাকরি পেয়েছিল। তারা এখনো ওই পদে বহাল থাকলে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার পাশাপাশি তথ্যও পাচার করতে পারে।
সম্প্রতি সরকারের বিশেষ এক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল পদে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শেখ হাসিনা সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ। অভিযোগ উঠেছে, দেহরক্ষীদের অনেকে ছাত্রলীগ কোটা এবং বৈষম্যবিরোধী রাজনৈতিক সুপারিশে পুলিশে নিয়োগ পান। মূলত তারাই সরকারকে রাজনৈতিক সংকটে ফেলতে পারে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্যসহ ভিআইপিদের নিরাপত্তায় দেহরক্ষী (বডিগার্ড) হিসেবে নিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বিএনপি সরকার। অভিযোগ উঠেছে, এই দেহরক্ষীদের বেশির ভাগ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত। তারা তৎকালীন মন্ত্রীদের এবং পরবর্তী সময়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকের দেহরক্ষী ছিলেন। এবারও সেই একই পদে তারা বহল রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথের আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বিগত সরকারের সময়ে দেহরক্ষী থাকা কাউকে রাখা হবে না। কিন্তু পরে তদবির, সুপারিশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎকোচের কারণে বিগত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেককে নিযুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে এবং রাজনৈতিক সুপারিশে আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান সরদার নুরুল আমিন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, এমপি-মন্ত্রীদের পিএস, এপিএস, গাড়িচালক ও নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তিদের অনেকে আওয়ামী লীগ সমর্থক- এমন কিছু তথ্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। এরপর থেকে এসব বিষয়ে আমরা কাজ করছি। অন্যদের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বাকিদের বিষয়েও সরকারকে জানানো হবে। এ ছাড়া আমাদের যারা পুলিশের লোকজন রয়েছে, তাদের বিষয়ও আমলে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশেষ শাখার (এসবি) পলিটিক্যাল জোনের দায়িত্বরত এক কর্মকতা জানান, এসব বিষয়ে বেশকিছু অভিযোগ উঠেছে। এরপর কয়েকজনকে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এসবি থেকে এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্যকে গানম্যান/দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তাদের একটি বড় অংশই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এবং ওই সরকারের মন্ত্রীদের নিরাপত্তায়ও ছিলেন। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে গোয়েন্দারা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে অভিযোগ ওঠা দেহরক্ষীদের অনেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে ‘ছাত্রলীগ কোটায়’ অথবা আওয়ামী লীগের নেতাদের আত্মীয়স্বজন এবং সাবেক এমপিদের সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে বর্তমান বিএনপির সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে তাদের নিযুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেওয়ার আগেই এসবি থেকে তাদের জন্য দেহরক্ষী বাছাই করা হয়েছিল। তখন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে এমন দায়িত্বে না রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল। তবে পরে তা ভেঙে বিতর্কিত অনেককে দেহরক্ষী নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগে এসবির সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার তদবির ছিল। কোনো কোনো তদবিরের পেছনে উৎকোচের ঘটনাও ছিল। পুলিশ সদরেরও কেউ কেউ কারো কারো ব্যাপারে সুপারিশ ছিল।
এসবির অতিরিক্ত আইজিপি সরদার নুরুল আমিন বলেন, বেশকিছু তথ্য থাকায় এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অনেককে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, এমনটা যদি হয় বা হয়ে থাকে, তাহলে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিকও নয়।
গোয়েন্দা তথ্য ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বেশ কয়েকজন ভিআইপির দেহরক্ষী পরিবর্তন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের দেহরক্ষী রয়েছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন জায়গায় রদবদল করার কথা শোনা যাচ্ছে।
সূত্র বলেছে, নিযুক্ত করার কিছুদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভিআইপিদের সঙ্গে বেশ কয়েকজন দেহরক্ষীর স্বাভাবিক আলাপচারিতায় তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ পায়। পরে বিষয়টি পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) অবহিত করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (কনফিডেনশিয়াল) কামরুল আহসানের সই করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এ ধরনের নিয়োগ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্যের গোপনীয়তা বিনষ্টের ঝুঁকি তৈরি করছে।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জানান, বর্তমান বিএনপি সরকারের এমপি ও মন্ত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষাসহ বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অনেকে আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থক বলে অভিযোগ উঠেছে। এগুলো নিয়ে দল আলোচনা করতে পারে। পাশাপাশি সরকারও সতর্ক রয়েছে বলে মনে করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা।
বিএনপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, এমপি-মন্ত্রীদের, পিএস, এপিএস ও নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যারা নিয়োজিত রয়েছেন, তারা আওয়ামী লীগের অনুসারী হতে পারে, যেহেতু তারা সরকারি চাকরি করেন। যদি তাদের পরিবর্তন করা না যায়, সেই ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তাদের দ্বারা সরকার কোনো সংকটে না পড়ে। আশা করি এসব বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক চিফ হুইপ নোয়াখালী-২ আসনের এমপি জয়নুল আবদিন ফারুক জানান, অনেকেই সরকারি চাকরি করেন। তারা আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। এর মধ্যে অনেকেই আওয়ামী লীগের সমর্থক হতে পারেন; কিন্তু তারা সরকারি চাকরিটাকে বড় করে দেখলে তাদের জন্য ও দেশের জন্য ভালো। তবে এসব বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও গোপালগঞ্জ-১ আসনের এমপি সেলিমুজ্জামান সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, যারা চাকরি করেন তাদের চাকরির দিকে মনোযোগী হওয়া জরুরি। যদি এমনটা হয় তাহলে আমরা আরও সতর্ক হবো এবং সরকারও সতর্ক থাকবে বলে আশা করি।






সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন